স্বপ্নযাত্রা

এক



স্বপ্নের দেশ আর মেঘের দেশে তার যাতায়াত বহুদিনের। কিন্তু গেলবার যে আসল, আর দেশে ফেরা হয় নি তার। প্রায় ৫ বছর হয়ে গেল। মনটা কেবলই দেশে যাই যাই করছে! এবার দেশে না গেলে যেনো চলছেই না। খুব নস্টালজিক হয়ে পড়েছে সে। এবার সে সিরিয়াসলি ভাবছে, ‘দেশে চলেই যাই। সুখে – দুঃখে, বিপদে – সংকটে দেশে লড়াই – সংগ্রাম করে বাঁচি, কিংবা মারাই পড়ি! জীবন তো একটাই, মরতেই তো হবে একদিন!’ তবে দেশে ফেরার আগে, ‘সব কটা স্ট্যাট ঘুরে দেখে যাই’ – এমন ইচ্ছেও ভেতরে ভেতরে খুব প্রবল। এই দেশের ৫০ টা স্ট্যাট! বিশাল একটা দেশ। সব থেকে যে ছোট স্ট্যাট, সেটাও বোধ করি বাংলাদেশের থেকে বড় হয়ে থাকবে। আর সৌন্দর্যের কথা বললে সেটা হবে বাহুল্য! এটি অসম্ভব সুন্দর আর অপার স্বপ্নময়তার দেশ। এখানে আইন কানুন খুব কম কিন্তু তার প্রয়োগ খুব বেশি। এখানে অন্যায়ের শাস্তি হয়। আগে কিংবা পরে। আর তাই এখানে সকলেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নিয়ম ভাঙলেই ১০০-৩০০ ডলারের টিকিট তো আছেই, জেলও হতে পারে! তাই দু’শো টা দেশের মানুষ একদেশে বাস করলেও কোন বিশৃঙ্খলা নেই বললেই চলে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অরূপ রূপের লীলাভূমি এ দেশ! শেষবার যখন আমার সাথে কথা হলো, আমার বন্ধু শূন্যমেঘ রোদ্দুর মারাক টীম ভিউয়ারে এই অপরূপ রূপের দেশ আমেরিকার গল্প বলেছিল। মেঘকে বন্ধু মহলে ‘শূণ্যমেঘ নকরেক’ নামেই সবাই চেনে।

মেঘের কাছেই শুনেছি, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বললে, এদেশের সৌন্দর্য বাংলাদেশের কাছে নস্যি! আর সব দিক থেকেই বাংলাদেশ ঠিক তার উলটো! এখানে প্রায় কেউই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। মানুষ খুন করেও এখানে বীর দর্পে, বুক ফুলিয়ে, সদম্ভে চলা যায়। দাপিয়ে বেড়ানো যায় সবখানে। ধর্ষণ পর্ব সেরে, কোন মেয়েকে গলা টিপে মেরে ফেললেও এখানে এদিক ওদিক করে পার পাওয়া যায়।এখানে কারোর মান – সম্মান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় টানা – হ্যাচরা করেও বীর হওয়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রে এমন হলে লাইফ খতম! জীবন টাই এলোমেলো হয়ে যাবে। আলি-জালি’ হয়ে যাবে সব!’

ওর কথা ঠিক। আমাদের দেশের পাতিনেতাদের কথা আর কী বলব? অনেক বড় বড় এম পি, মন্ত্রী এমন কি বিরোধী দলীয় নেতাও ট্র্যাফিক এড়িয়ে চলতে গিয়ে রাস্তার উল্টো দিকে ছুটেন! ওবায়দুল কাদের কিংবা তাঁদের মত উল্টো পথে হাটা কিছু মন্ত্রীরা ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে যান। মিলিয়ে যায় তাঁদের অনেক ভাল ভাল কাজ কারবার। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে তাঁদের ভাল কিছু করার সব প্রচেষ্টাও। তারপরেও, তাঁরা সবকিছু ‘নষ্টদের অধিকারে’ যেতে দেন না। এটাই আমাদের জন্য আশার কথা, স্বপ্ন জিইয়ে রাখার কথা। অনেকেই ওঁদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেন, হাসা – হাসি করেন। ভাল কাজ করেও এখানে হাসির পাত্র হন। অদ্ভূত এক এই দেশ! আবার কেউ কেউ ভালোবেসে ‘ফাটা কেষ্ট’ মন্ত্রী বলেন!

জোনাকির নিভে নিভে জ্বলা ক্ষীণ আলোর মত সেগুলোই আশাহত কোটি কোটি মানুষের প্রেরণা হয়ে থাকে। মেঘেরা এখানেই দেশে ফেরার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। এঁদের কাজ দেখেই কোটি তরুণ – তরুণী, ছাত্র সমাজ স্বপ্নের বীজ বুনে যায়। বুকের ভেতর একটা ছোট্ট স্বপ্ন লালন করে চলে এই ভেবে, একদিন আমাদের দেশ সত্যিই ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ’ হবে। সেদিন আমরাও বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারব। এদের অনেকেই আজও বিশ্বাস স্থাপন করে বসে থাকে, “যতদিন হাসিনার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ!’’
কিন্তু যখন দেখেন আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেন, চলেশ রিছিল, শহীদ পীরেন স্নাল কিংবা আরও বড় বড় নেতা শাহ এ এস এম কিবরীয়া এম পি, আহসান উল্ল্যাহ মাস্টার এম পি দের হত্যাকান্ডের কোন বিচার হয় না; কিংবা যখন দেখেন কিশোরী ছাত্রীরা বখাটে ছেলেদের দাপটে স্কুল, কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, দেশের বাঘা প্রশাসন অন্ধের মত চোখ বন্ধ করে থাকে, তখন রাজ্যের হতাশা ভীড় করে এদের চোখে – মুখেও! যখন দেখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনী নিজের হাতে সাঁওতাল পল্লীতে আগুন লাগাতে ব্যস্ত, মনে হয় কী হবে এই দেশ দিয়ে, এই স্বাধীনতা দিয়ে? আবার পরক্ষণেই মনে হয়, এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই আকাশ আমার, এই বাতাস আমার; এখানে জম্মেছি, এখানে লড়াই – সংগ্রাম করেই বাঁচতে হবে।



মেঘের অনেক বন্ধু আছে যারা দেশের সরকার যা করে তারই বিরোধিতা করে সবসময়। কাজে বিরোধিতা, অকাজেও বিরোধিতা। যেমন, রামপালে বিদ্যুত প্রকল্প হবে না, হবে না! হবে না! হবে না! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে ট্রেন – সাবওয়ে হবে না! হবে না! হবে না!

মেঘ বলে, রামপালে বিদ্যুত প্রকল্প হবে না, অমুক খানে হবে না, তমুক খানে হবে না । কোথায় হবে? তাহলে, বিদ্যুত কী আসমান থেকে আসবে? বিদ্যুত প্রকল্পই বা লাগবে কেন? বিদ্যুত না থাকলে কি আমাদের চলবে না? চলবে না? ওহ! চলবে না। তাহলে কোথাও না কোথাও আমাদের এই সব প্রকল্প করা লাগবে। এখন কথা হল, কত কম ক্ষতি করে, সম্ভব হলে কারোর ক্ষতি না করে প্রকল্পের কাজগুলো এগিয়ে নেয়া যায় কি না সেটা দেখা। কে দেখবেন এসব? তবে সরকার বাহাদূরকে যেখানে প্রকল্প করা হবে সেখানে অবশ্যই সে এলাকার মানুষের, “Pre and prior consent’ নেয়া উচিত! এটা কি খুব কঠিন কাজ? ‘Impossible? ’ “Impossible নিজেই তো বলে, “I/m/possible!” Impossible আবার কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে ট্রেন – সাবওয়েই বা করা দরকার কি? ট্র্যাফিক জ্যাম কি কমানোর দরকার আছে? ট্র্যাফিক জ্যাম হয় বলেই তো মানুষ একটু বই টই পড়ছে বাসে বসে! বিশ্বের বড় বড়, বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে কি ট্রেন যায় না? ওতে কি ওদের পড়াশুনা থেমে থাকে? আজব চিন্তা আমাদের। গণতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে আমরা সবসময় ‘ক্ষমতা দেখাতে চাই’। দূর ছাই! কী সব ভাবছি? মেঘ ভাবে।



আমাদের দেশে, ইদানীং দেখছি কিছু প্রকৌশলীরা লোভের সীমা ছাড়িয়ে, লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে বিল্ডিং তৈরী শুরু করছেন। মেঘ ভাবে, ‘কি বুদ্ধি এদের! বাঁশের বদলে পাটকাঠি দিয়ে বিল্ডিং টা বানালে আরও লাভ হতো জানলে ওরা হয়তো সেটাও করে ফেলত! ভাগ্যিস ওদের ঐ বুদ্ধিটা আসে নি!’
এঁদের শাস্তি হবে তো? না হলে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করবে। এটা বুঝার জন্য কারোর পণ্ডিত হওয়া লাগবে না। তবে ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’ The Ancient Mariner কবিতা, গল্প অনেকেই আমরা পড়েছি। ‘Natural Punishment’ বলে কিছু তো আছেই। নাস্তিক – আস্তিক এই বিষয়ে একমত!
মেঘ এসব ভাবতে ভাবতে আবার পেছনে হাটে, ভাবে আমাদের দুঃখিনী এমন একটা দেশ, ঘুষ ছাড়া এখানে স্কুল – কলেজ শিক্ষকগণ এমপিও ভুক্ত হতে পারেন না। পারসেন্টেজ ছাড়া এখানে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ কারবার চলে না। দুধশূণ্য পানি আর বিষাক্ত পাউডার দিয়ে শিশুদের জন্য গুড়ো কিংবা তরল দুধ তৈরী করে বাজার জাত হয়। ফলে ফরমালিন, মূলে ফরমালিন, চতুর্দিকে ফরমালিন আর ফরমালিন। এ দেশ ফরমালিনময়। মাছে ফরমালিন, মাংসে ফরমালিন, সবজিতে ফরমালিন; আমরা যাই কোন দিকে? কি খেয়ে বাঁচি? কবে যেনো ভালোবাসাতেও বাঙালি জাতি ফরমালিন দিতে শুরু করে! চিংড়ি মাছের মাথায় ভারী জেলি দিয়ে ওজন বাড়ানো, চালে – ডালে পাথর মেশানো, কি হয় না এখানে? কেউ কি ভাবতে পারেন নর্দমার নোংরা পানিতে তৈরী হয় মজাদার চটপটি? মাশাল্লাহ! আল্লাহ চাহে ত আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাব এ সবে যে কোন দিন! আসলে আমাদের কম্পিটিটরই হয় ত নেই এসব তাক লাগানো কাজে!
কিছু বড় বড় কুকুর ছানা আছেন, যারা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য স্বশরীরে যেতে পারেন না। তাঁরা বাসায় ডাক্তার ডেকে পাঠান। ডাক্তার সাহেব রা বাসায় না গেলে রোগী নিজেই ব্যাঘ্রমূর্তি রূপ নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হন। ‘হালুম’ করে ডাক্তারদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই বাঘেদের কিল-ঘুষিতে এককালীন দেশ সেরা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী, ডাক্তারদের দাঁত পড়ে যায়। আরও কত খবর আমরা পড়ি! আহা নেতা, উহু নেতা। কত বড় চেটের বাল!



সৌন্দর্যের পূজারী তো আমরা সবাই। আর ভয় তো সেখানেই! ভুলভাল করে স্নো পাউডার মাখতে গেছেন তো মরে গেছেন! দেশের অনেক প্রসাধনী সামগ্রী তো বটেই, বিশ্বসেরা ব্র্যান্ড এর প্রসাধনী সামগ্রীও এখন আমাদের সোনার দেশে দেদারসে তৈরী হতে দেখা যায়; টিভি সংবাদের চিত্র দেখে অন্তত তাই মনে হয়! এরকম আরও কত তেলেসামাতি কারবার চলে এখানে। এগুলো দেখার দায়িত্বে যারা আছেন, তাঁরা মাসোহারা নিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। শস্য নিরাপত্তার জন্য যে দেওয়াল, সে দেয়াল এখানে অকার্যকর। এখানে বেড়া-ই খেত খেয়ে ফেলে। এটাই যেনো স্বাভাবিক! এটাই যেন নিয়ম!

সহজ করে বললে, আমাদের দেশে হাজার হাজার আইন, কিন্তু তার কোনটাই প্রায় কেউ মানেন না! আইনের প্রয়োগও খুব সীমিত! বড়লোকদের জন্য যেন এখানে কোন আইন নেই! আইনের সব ধারাগুলো যেন সব গরীব, নিরীহ, খেটে খাওয়া মানুষ আর ছোট লোকদের জন্য। এই আইনগুলো সংবিধানের ভাষায়, “পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর” জন্য! কত উৎপল নকরেক আর লিমনের মত নিরীহ মানুষেরা এখানে পঙ্গু হয়ে যায়, কত শিশু আমাদের কিছু বীর তরুণদের পিটান খেয়ে অকালে ঝরে পড়ে, আর কত গরীব মেধাবী ছাত্রী, বাবা-মায়ের-ভায়ের আদরের সোহাগী জাহান তনুরা এখানে ধর্ষিতা হয়, খুন হয়ে যায় ক্যান্টনমেন্ট এর মত সুরক্ষিত অঞ্চলেও। এখানে তদন্তের নামে কত নাটক হয়, প্রহসন হয়। দেশের কিছু দাপুটে পত্রিকায় শিরোনাম আসে, “ ধর্ষণ নয়, ভালুকের আক্রমণে মারা গেছে তনু!” মারহাবা! মারহাবা। এই না হলে আমরা বাঙালি? আমরা সব পারি! ‘খোদার কসম, তনু বিষ খেয়ে মরেছে!’ ক’দিন পরে এইটাও আমরা বলতে পারব। আমরা এও বলতে পারব, ‘কে তনু? কীসের তনু? তনু নামে ওখানে কেউ ছিল না!”



আমাদের দেশের আইন তার নিজের গতিতে চলতে থাকে, চলতেই থাকে, চলতেই থাকে! আমাদের আইন যেনো ‘ব্রেকহীন’ রেলগাড়ি! আর আমরা সাধারণ মানুষেরা? আমরাও থেমে থাকি না, চলতেই থাকি, চলতেই থাকি। এটাই তো গণতন্ত্র! জনতন্ত্র, গণতন্ত্র। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই আমরা সব ক্ষমতা কাজে লাগাই। ভাল – মন্দ বুঝার টাইম আমাদের নাই। আমাদের কাছে অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নাই, বর্তমানই সব! আমাদের আছে গণতন্ত্র। আমরা আমাদের নিজের গুয়াই কাঁচি চালাই, রক্তাক্ত হই, আনন্দ পাই। এসবের জন্যই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ জীবন দিয়েছি, দুই লাখ মা – বোনের ইজ্জত দিয়েছি। আমরা এখন যা খুশি করতে পারি। আমরা বীরের জাতি, স্বাধীন জাতি। আমাদের গুয়া আমরা মারব কোন শালার কি? যখন যা খুশি করতে পারার নামই গণতন্ত্র! আমরা এই গণতন্ত্রে সয়ে যাই সবাই …

আর মেঘ রোদ্দুর মারাক? ৫০ টি স্ট্যাট ঘুরে দেখার স্বপ্ন নিয়ে সে ছুটে। ছুটে চলে স্বপ্নরাজ্যের সন্ধানে! যেন অরূপ রূপের সন্ধ্যানে তার এ যাত্রা। সে জানে, সহজ কাজ নয়। এটিও তার বন্ধু মুসা ইব্রাহীম এর হিমালয় জয়ের মতই কঠিন কাজ! আমেরিকার দু’ একজন প্রেসিডেন্ট ছাড়া হয় ত পুরো আমেরিকা অনেকে দেখেনই নি! ৫০ টি স্ট্যাট ঘুরে দেখা তার চায় – ই চায়! কিন্তু এত বড় একটা সফর শেষ করাটা খুব এক্সপেন্সিভ হবে। ভাবল, ড্রাইভিংটা শিখে নিয়ে গাড়ি একটা কিনেই ফেলবে! ওতে কিছু টাকা সেভ হবে। সামনে জাতীয় ইলেকশান! দেশে ফিরে গিয়ে এমপি – মন্ত্রী হবার বাসনাও তো আর মেরে ফেলতে পারে না! এজন্য অনেক টাকা-পয়সারও তো দরকার, সে মনে মনে ভাবে …



বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি চারটি। এটা মেঘের সাত বছরের মেয়ে সিলগা সাংমাও জানে! এ চারটি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।
জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র কি দেশে আছে? আছেই তো! আছে বলেই তো এখনও আদিবাসী গারো, নাক বুচা, চোখ উঁচা মানুষ এডভোকেট প্রমোদ মানকিনও এম,পি হতে পারেন, মন্ত্রী হতে পারেন। পারেন না? অনেক খুন, ধর্ষণ হচ্ছে। কিন্তু আসামীরা তো ধরাও পড়ছে, পড়ছে না? বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে ৪২ বছর পরে! হয় নি? রাজাকার, আলবদর, আল-সামশ এর বিচার হচ্ছে ৪৪ বছর পরে, হচ্ছে না? হচ্ছেই তো। তাহলে প্রব্লেম কোথায়?
ধর্মনিরপেক্ষতা? রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। কেউ কারও ধর্ম পালনে বাধা দিবে না। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে তো এই, তাই না? কে আপনাদের ধর্ম পালনে বাঁধা দিচ্ছে? কে আপনাদের ধর্ম পালনে বাঁধা দিচ্ছে?

কিন্তু হিন্দু খেদানো, শিক্ষক পেটানো, নাস্তিকতার দোহাই দিয়ে মানুষ কোপানো, ধর্ম যাজক হত্যা কিসের আলামত?
‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংবিধানে লেখা আছে। ‘ইসলাম’ মানে ‘শান্তি’। তাহলে ‘রাষ্ট্রধর্ম শান্তি’ সংবিধানে লেখা থাকলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা কোথায়? শান্তিই তো চায় সবাই, চায় না?
আসলে সমস্যা নেই! জমি টা অন্যের নামে লেখা হয়ে গেল! এ রাষ্ট্র আমাদের সবার, শুধু কাগজ পত্রে ‘ইসলামের!’ আরে বাবা, রাষ্ট্র তো আর এক খন্ড জমি নয়, বেচা – বিক্রি হবে! আমার তো প্রব্লেম নাই। কার প্রব্লেম? কাদের প্রব্লেম? দেশে সবাই সুখে শান্তিতে থাকতে পারলেই তো হল! সবাই সুখে শান্তিতে আছেন তো? আছেন? কী নেই? ‘বাহির পানে চোখ’ মেলে তাকালেই তো উত্তর মিলবে। মিলবে না? দলিল – দস্তাবেজ যে ধর্মের নামেই হোক, আমাদের প্রব্লেম নাই। জমির ফসলের সমান ভাগ যদি পাই! দলিল আমার ধর্মের নামে, কিন্তু আমি ফসলের কিছুই পাই না, তাহলেই প্রব্লেম। তাহলে, প্রব্লেম কি? আসলে, সব ধর্মই তো শান্তির কথা বলে। কোন ধর্ম কি কাউকে খারাপ হওয়ার শিক্ষা দেয়? চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণের শিক্ষা কী কোন ধর্ম কখনও দেয়? কেউ জানেন?



আসলে প্রব্লেম টা কী জানেন? প্রব্লেম টা আমাদের মগজে, মননে, চিন্তায়, চেতনায়। আগে সেটার পরিবর্তন জরুরী। তবে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? এসব চুলোয় যাক! সবার ভেতরে যে বিড়াল টা আছে, সে বিড়ালটার গলায় ঘন্টা বাঁধি! ঝামেলা শেষ! দুত্তারি, কী সব ভাবছি? মেঘ ভাবে।
মেঘের কিছু বন্ধু আছে, তারা মনে করে, তারা এই জগতেই তাদের ‘স্বর্গ রচনা’ করে ফেলেছে! তারা সুখে আছে, শান্তিতে আছে। আবার ঐ একই মুখে বলে, ‘দেশে এখন অরাজকতা চলছে, এখানে আর থাকা যাবে না। এখানে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই’। তারা সব কিছুতে আগুন দেখতে পায়। চালে আগুন, ডালে আগুন, তেলে আগুন, বেগুনে আগুন। ‘সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে, সবখানে!’ এদের কাছে দেশটা এখন আস্ত একটা ‘দোজখ’। এঁদের কেউ কেউ আবার বলে, ‘স্বর্গ – নরক’ মানুষের কল্প কাহিনী। যুক্তি দিতে গিয়ে তারা স্টীফেন হকিং এর কথা তোলেন। কেউ কেউ আবার তাদের বিশ্বাস – অবিশ্বাসের সাফাই-এর স্বপক্ষে বলে, “বিশ্বের সব জ্ঞানী মানুষ, বড় বড় বৈজ্ঞানিক নাস্তিক ছিলেন।” তারা Jules Renard এর এই গল্প করে, “I don’t know if God exists, but it would be better for His reputation if He didn’t.”
আবার কেউ কেউ বলে, “Give a man a fish and he will eat for a day; teach a man to fish and he will eat for a lifetime; give a man religion and he will die praying for a fish.”
মেঘ ওদের প্রখ্যাত লেখক Francis Bacon এর কথা বলে, “যে ব্যক্তি বিজ্ঞান অল্প জানবে, সে নাস্তিক হবে। আর যে গভীরভাবে বিজ্ঞানের দর্শন জানবে, সে অবশ্যই ঈশ্বর বিশ্বাসী হবে।”
[ “Knowledge is the rich storehouse for the glory of the Creator and the relief of man’s estate,” Francis Bacon said . “A little philosophy inclineth man’s mind to atheism, but depth in philosophy bringeth men’s minds about to religion.” ] “The more I study science, the more I believe in God” বলেছেন Albert Einstein। তাঁর থেকে বড় বিজ্ঞানী আর কে ছিলেন? তিনি ধার্মিক ছিলেন। কোটেশান গড় গড় করে বলায় মেঘের জুড়ি নেই। ছাত্র জীবনে তাই তার বন্ধুরা ঠাট্টা করে নাম দিয়েছিল, ‘মিঃ কোটেশন’ কারন একটা ব্যাখ্যা লিখতেও সে ১৭ টা কোটেশান মেরে দিয়েছিল একবার! পরীক্ষার খাতাতেও ৪ লাইন পর পর কোটেশান মেরে দিত সে!



মেঘের কিছু ছাত্রও আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবানে বিশ্বাস করে না। এই নিয়ে মাঝে মাঝে তর্ক হয় কিন্তু ওতে তাদের মধ্যে সম্পর্কের হেরফের হয় না। কেউ ধর্মে বিশ্বাস করবে কি করবে না, তা একান্ত নিজস্ব। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কিছুই নেই। মেঘও তাই মনে করে।

দুই

ড্রাইভিং লাইসেন্স টা যেদিন হাতে পেল, সেদিনই বন্ধু তাজুল ইসলামকে নিয়ে গাড়িটা কিনে ফেলল মেঘ। তাজুল তার বিশ্ববিদ্যালয়বেলার বন্ধু। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়েছে, আর মেঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুব মেধাবী ছাত্র ছিল তাজুল। টিভিতে সাংবাদ পড়ত দেশে থাকতে। তার বাবা সারা জীবন মসজিদের মোয়াজ্জিন ছিলেন। কিন্তু তাদের পরিবার টাকে ধর্মীয় গোড়ামী এক বিন্দু স্পর্শ করতে পারে নি। মোয়াজ্জিন সাহেবের ছেলে তাজুল সারা জীবনে একবারের জন্যও বলে নি, “আমাদের ধর্ম সেরা।” মেঘের অনেক বন্ধু যারা ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ পালন করেন, তাদের প্রায় সবাই কোন না কোন ভাবে দিনে অন্তত একবার এই একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে, ছলে, কৌশলে। তাজুলের কথা, কাজ আর আচরণেই প্রকাশ পেত, সে যে ধর্ম পালন করে তা ‘শান্তির ধর্ম, সেরা ধর্ম’। মানুষের সুখে – আনন্দে কত আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া যায়, তাকে দেখেই শিখেছে মেঘ। আবার কারো দুর্দিনে দেখেছে, কতটা সহমর্মী হওয়া যায়। তাজুলের মত তরুণেরা এই জগতে খুব বিরল প্রাণী! কালে ভদ্রে এদের জন্ম হয়। মেঘের বন্ধু ভাগ্য খুব একটা ভাল নয়, তা সে ভালো করেই জানে। কিন্তু তাজুলের মত বন্ধু ক’জনের কপালে জুটে? মেঘ এই নিয়েও ভাবে।

মেঘ গাড়ি কিনবে শুনে তাজুল কপাল কুচকাল! ‘সে কি! গাড়ি কেন এখনই? নিউ ইয়র্কে তো গাড়ি লাগেই না। প্রতি ২-৩ মিনিট পর পর ট্রেন, বাস আসছে আর যাচ্ছে। শুধু শুধু ৩০ – ৪০ হাজার কেন খরচ করবি? তুই না দেশে ফিরবি, এমপি ইলেকশান করবি? আমি তো আশা করছি, ওবায়দুল কাদের সাহেব একজন যোগ্য সঙ্গী পাবেন! ’
শেষের লাইনে মেঘ ঠাট্টার ইঙ্গিত খোঁজে! মেঘ বলে, “হা হা হা, তুই বলতে পারলি না, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নেক্সট ক্যাবিনেটে সব থেকে তুক্ষার মন্ত্রী পেতে যাচ্ছেন!”
তাজুল বললে, সে কথা বললে কি বেশি বলা হত? কত যদু মদু কদু আইন প্রণেতা হয়ে বসে আছেন। অনেকেই ক্লাশ টেন পাশ করেন নি। এরা নিজেদের পরিবারই ঠিক মত চালাতে পারেন না, দেশ চালাবেন কী করে? আমি তাই তোমেকে উৎসাহিত করি। জানি, খুব সহজ না। ভাল রাজনীতিকদের দেশে কদর নেই। শাহ এস এম কিবরীয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টাদের মত নেতাদের সব সময়ই লাইফ রিস্ক থাকে; তবুও ভাল, মেধাবী মানুষদের সেখানে যাওয়া উচিত। ‘নষ্টদের দখলে’ সব ছেড়ে দিতে নেই।
মেঘ বলে, বন্ধু, এসব ভেবে ভয় পাই না। ‘Che Sera Sera।’
– মানে?
– কেন, ড ফস্টাস নাটক পড়িস নি? সেখানেই এই ডায়ালগ টা আছে! মানে হল, “Whatever will be, will be”
– তা মন্দ বলিস নি।
তাজুল আবার প্রাসঙ্গিক আলাপের রেশ টেনে ধরে। বলে, ‘যা বলছিলাম, আগে স্টেল হয়ে নে। গাড়ি পরেও কেনা যাবে!’ কিন্তু মেঘ আর দেরি করে নি। সে বরাবরই কিছুটা এ রকমই! ইচ্ছে পূরণের সাধ্য হলে আর দেরি করে না। কিসের এত ভাবাভাবি, ‘জীবন তো একটাই! জীবন একটাই হোক আর দুই টাই হোক, সাধ আর সাধ্যির মধ্যে বিস্তর ফারাক রাখা উচিৎ না।’ সে ভাবে। কিন্তু মানুষের জীবন এমনই, কারো কারো সাধ্যি থাকলেও সাধ পূরণের কাছাকাছিও যেতে পারেন না। কিছু সাধ-আহলাদ তো তার নিজের রঙ আপনি হারায়! তাই মানুষ জীবনে শুধু দুঃখ খোঁজে পান। না পাওয়ার বেদনাও যে জীবনে বৈচিত্র্য আনে, এরও যে প্রয়োজন, তা অনেকেই জীবন চলে গেলেও উপলব্ধি করতে পারেন না। অসুখি মন, আসুখি হৃদয়, অসুখি আত্মা নিয়েই তাঁরা দেশান্তরি হন, চলে যান না ফেরার দেশে।



সে যাই হোক, খুব পছন্দের গাড়ি কিনেই ফেলেছে মেঘ। সাদা রঙের গাড়ি। পাজেরো টাইপের। একটা রাজকীয় ভাব ওতে। বলা যায় ছোট খাটো একটা স্বপ্ন পূরণ। অবশ্য আমেরিকায় গাড়ি, বাড়ি কেনা টা খুব কঠিন কিছু না। এই ক্রেডিট টা ঠিক থাকলেই হল!

তিন
এই কয়দিন গাড়ি নিয়ে মেঘ তার পুরোন বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গেছে। তার পুরোন ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সাথেও দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। দেখা হয়েছে নিউ ইয়র্ক কোড এন্ড ডিজাইন একাডেমি’র শিক্ষকদের সাথে। দেখা করেছে পিপল এন টেক এর টিচার এবং ক্লাশ মেটদের সাথেও।
‘পিপল এন টেক’ আমেরিকায় ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজিতে খুব বিখ্যাত। তরুণ প্রকৌশলী আবু হানিপ স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশী তরুণ – তরুণীরা স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসে আর ট্যাক্সি চালাবেন না, হোটেল – রেস্টুরেন্ট কিংবা গ্রোসারিতে কাজ করবেন না। তাঁরা এই দেশে পৃথিবীর দু’শো টি দেশের মেধাবী, চৌকশ তরুণদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ‘হোয়াইট কালার’ জব করবেন।

আবু হানিপ তাঁর এই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি ‘PeopleNTech’ নামে একটি ইনফরমেশন ট্যাকনোলজির উপর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ফারহানা ফেরদৌস নামের আরেক মেধাবী বাঙালি তরুণী তাঁর সে স্বপ্ন পূরণে তাঁর সাথে ঐ মহতী উদ্যোগে যোগ দেন। দিনরাত তাঁদের শ্রম, ঘাম, মেধা দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলেন একটি আইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সারা বিশ্বের প্রায় চার হাজার তরুণ – তরুণীকে এই দুই বাঙালি যুগোপযোগী এবং বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে আই টিতে লোভনীয় চাকুরী পেতে সহযোগিতা দিয়েছেন এ পর্যন্ত। কম কথা?

এই ‘PeopleNTech’ এর মূল ক্যাম্পাস যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াতে হলেও এর এখন নিউ ইয়র্ক, নিউজার্সি এবং ব্রংক্সে আলাদা শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে এখন যে কেউ আইটি’র উপর প্রশিক্ষণ নিতে পারছে। দেশের বাইরে কানাডা, ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশেও এর শাখা ক্যাম্পাস আছে। চিন্তা করা যায়? এই ‘PeopleNTech’ এর ছাত্র – ছাত্রীরা যারা যুক্তরাষ্ট্রে ‘মূলস্রোতের’ জব করেন শুধুমাত্র তাঁরাই প্রতি বছর ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মূদ্রা আমাদের বাংলাদেশে পাঠান। দুই চারজন গুণীজনদের পাশা পাশি কত যদু – মধু – কদুরা দেশে কত পদক ভাগিয়ে নেন প্রতি বছর। কিন্তু ফারহানা ফেরদৌস কিংবা আবু হানিপ এর মত মানুষেরা সে তালিকার ধারে কাছে পৌঁছাতে পারেন না।অবশ্য এঁদের মত মানুষেরা এগুলো নিয়ে ভাববার ফুরসৎ পান বলেও মনে হয় না। এঁদের নাম ইতিহাসে লেখা হয় না। তাঁরা কোন গল্প কবিতা কিংবা উপন্যাসের উপজীব্য কোন বিষয় হয়ে উঠেন না। তাঁরা শুধু দিয়ে যান, নীরবে, নিভৃতে! পৃথিবী থেকে চলে গেলে পর আমরা গলা ফাটিয়ে বলি, “ইস! বড় ভালো লোক ছিল!”



মেঘ তাঁর আবু হানিপ স্যারের সেল ফোন নাম্বার টা মনে করার চেষ্টা করল। কতবার ফোন করেছে, ভুলে যাওয়ার কথা না! বোধ করি ৭০৩-৫৮৬-৭৮৪৮ ই হবে। অনেক দিন পর ফোন করছে। ‘নিশ্চয়ই ঝাড়ি খাব আজ।’ মেঘ ভাবে। তাঁর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল সে। ২৪ হাজার ডলারের জব করে শুনে হানিপ স্যার তাঁকে স্কলারশীপ দিয়ে তাঁর স্কুলে পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন! তার মনে আছে প্রথম দিন তিনি কী বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “কোন মানুষ মেধাবী কিংবা মননশীল কি না তাঁর সাথে ২-৩ মিনিট কথা বললেই বুঝা যায়। আপনার সাথে ১৫ মিনিট কথা বললাম। আপনার যে মেধা আছে, আপনি এক লাখ ডলারের উপরে বেতন পেতে পারেন এই দেশে! কী জন্য ঐ বেতনে সন্তুষ্ট থাকছেন, আমাকে বলেন? আপনার কোর্স ফী সমস্যা হলে বলবেন। শত শত বাংলাদেশীকে বেতন ছাড়াও আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে জব দিয়েছি। তাঁদের অনেকেই আমাদের ছাত্র, সে কথাও বলেন না! এতে আমাদের কোন দুঃখ নেই।” কথাগুলো ফ্ল্যাশব্যাক করে ভাবতে ভাবতে ফোনের বোতামে আঙুল রাখে মেঘ রোদ্দুর। যা ভেবেছিল! ফোন নাম্বার টা ঠিকই আছে! ফোন ধরেই বললেন, “আরে মেঘ রোদ্দুর সাহেব, কেমন আছেন? আপনার কোন খবর পাই না বহুদিন! আপনি কিন্তু ক্রাইম করে বেড়াচ্ছেন! এত এত মেধা আপনার, তাঁর কিছুই ব্যবহার করছেন না। আপনার পরিবার, সমাজ, দেশ এবং পৃথিবীকে আপনি অনেক কিছু দিতে পারতেন। কিন্তু আপনি তা দিচ্ছেন না। এই টা কিন্তু সিরিয়াস একটা ক্রাইম! ক্রাইম এন্ড পানিশম্যান্ট উপন্যাস টা নিশ্চয়ই পড়েছেন? ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আপনি, বেশি কথা বললাম না!”
ভরকে গিয়ে মেঘ বলল, “স্যার, স্যার একটু গুছিয়ে নিই? আমাকে একটু সময় দিন। আমি আপনার মুখ রাখব স্যার। ডেফিনিটলী আমি শীঘ্রই আইটি জবে জয়েন করব? বিলিভ মী, আমি আপনাকে হতাশ করব না স্যার।”

তিনি বললেন, আপনি আমার মুখ রাখেন আর না রাখেন। অন্তত নিজেকে ভালো অবস্থানে রাখেন।সময় পেলে বেড়াতে আসেন, এক সাথে ডিনার করব কোন ভাল হোটেলে! আমাদের ‘PeopleNTech’ এর প্রেসিডেন্ট নিউ ইয়র্ক ক্যাম্পাসে আসছেন। তিনি কিন্তু আপনার লেখা গান – কবিতা – গল্পের ভক্ত, সে খবর রাখেন?”
তিনি ‘না’ সূচক জবাব দেয়। আর জিপিএস এ ‘PeopleNTech’ এর এড্রেস ঢালে!
সে যাই হোক, এই ক’দিন বেশ হৈ হুল্লোড় করে কাটিয়েছে। যেখানে মন চায় ঘুরে বেড়িয়েছে ইচ্ছে মতন। সেখান থেকে ফেরার পথে গতকাল সন্ধ্যায় ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট, কিন্তু বড় একটা ধাক্কা। জীবনটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল তার!
এ যেনো, ‘মেঘ নেই এই আকাশে, তবু যেন বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো, জীবনটা হল এলোমেলো’। মানুষের জীবন কত অনিশ্চিত! মানুষ কত অসহায়! ফীল করে নি আগে। এখন বুঝে।

চার



মেঘের পুরো একটা পা আর একটা হাতের অর্ধেক শেষ পর্যন্ত কেটেই ফেলতে হয়েছে! নিউ ইয়র্কের ভেল্ভ্যু হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানার উপর শুয়ে আছে। কথা সাহিত্যিক হূমায়ুন আহমেদ তাঁর মৃত্যুর আগে এই হাসপাতালের ঠিক এই ক্যাবিনের ঠিক এই বিছানাতেই ভর্তি ছিলেন বাসায় ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত! সে কথা তাকে ডাক্তার সাহেব স্মরণ করিয়ে দিতেই নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য ‘সেলিব্রেটি’ মনে হল। হোক না হাত পা হারিয়ে এখানে থাকার সুযোগ, হয়েছে তো – এই ভেবে কষ্ট ভুলার আপ্রাণ চেষ্টা করে! মানুষ যখন কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে যান, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখ যখন পেয়ে বসে, তখন ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজে একটু সুখ চান, স্বস্তি চান, মিথ্যে স্বান্তনা খুঁজেন। এটা মানুষের চিরন্তন স্বভাব। সেও তাই একটু ফাঁক খুঁজে! একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস খুঁজে…

পাঁচ

হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানা তার খুব পছন্দের। এখানে শুয়ে থাকলে নিজেকে পূত – পবিত্র মনে হয়। শান্তি শান্তি লাগে! কিন্তু হাত – পা হারিয়ে শুয়ে থাকাটা কত কষ্টের তা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব না বোধ হয়। একাকী ভাবছে আর ভাবছে, হাত পা ছাড়া মানুষের জীবন কেমন কাটে! আগামী জীবনটা কেমন কাটবে? প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হয়েছিল হাত আর পায়ের দিকে তাকিয়ে! এখন অবশ্য আর কষ্ট লাগে না।



গাড়ির ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তো মহা খুশি! কারণ গাড়ির খুব একটা ক্ষয় ক্ষতি হয় নি! সেও কিছুটা খুশি! অন্তত সব হাত পা কেটে ফেলতে হয় নি!

ছয়

বাংলাদেশ থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এড আব্দুল হামিদ, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা, সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এড প্রমোদ মানকিন এম পি, মন্ত্রী পরিষদের কিছু সদস্য, ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক অধ্যাপক আনিস আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক রাহেল রাজিব, বিবিসি’র শাহানাজ পারভীন, বাংলাদেশর প্রথম হিমালয় বিজয়ী মূসা ইব্রাহীম এবং বিশপ পনেন পল কুবি সি এস সি দেখতে এসেছেন শূণ্যমেঘ মারাককে। শাহনাজ আপা আর মূসা ভাই ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় মেঘের কলিগ ছিলেন। শাহনাজ আপা রিপোর্টার ছিলেন, মূসা ভাই আর মেঘ ছিলেন সহ – সম্পাদক। রাহেল রাজীব ছিলেন সেন্ট জোসেফ স্কুল এন্ড কলেজের সহকর্মী। খুব ভাল লেখক রাহেল রাজীব। অসম্ভব ভাল লেখেন।


মেঘ শুনেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তার ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড শাওকত হোসাইন, ড সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, ড ফখরুল আলম, ড নিয়াজ জামান এবং সহপাঠীদের মধ্যে সরল, মৃণাল, জামান, নীলমণি, রোকন, সাব্বির, সাজ্জাদ, সাগর, সরকার, পান্না, ফারজানা, সায়মা, পুতুল, লিজা, বরেন, সিমি, তানজিনা, অদ্রিতা, শাবানা, সালমা, নাসিমা, জেসমিন, শারমিন, ইফফাত, ঊর্মি, তন্বী, মৌ, চরু হক, নওশিন, আজাদ, টিটো, টিপু, হিল্লোল, আইরিন, তৌফিক, বিকাশ, শংকু, বাছার, জীবিতেশ, লরেন্স, আজাদ, আরিফ, দেব প্রসাদ, সুনীল, সুমনা, সোনিয়া, জুবাইদা, নদী নয়ন সহ অনেকেই এসেছিলেন। এঁদের সবাই এখন দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সরকারী – বেসরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। এদের কেউ কেউ সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক, এস পি, এ ডি সি, জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়ে গেছেন! সময় কত দ্রুত চলে যায়! ‘How does time fly!’ ‘কবে কবে আমাদের বয়স ৪০ ছুঁয়ে ফেলল?’ মেঘ অবাক হয়ে ভাবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Life begins at forty!’ অদের লাইফ শুরু হয়ে গেল। কে জানে এরপর কি হবে? কেমন হবে জীবন?

যদিও মেঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল, কর্মজীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে পিএইচডি শুরু করেছিল। কিন্তু শেষ করতে পারে নি। এ নিয়েও বন্ধু মহলে বেশ ঠাট্টা মস্করা চলে। ‘একদম রয়্যাল ডিপারট্মেন্ট থেকে চিতায়!’ আসলে মানুষের জীবন তো এমনই। কি বিচিত্র জীবন! জীবনের বাঁকে বাঁকে সাসপেন্স!
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় প্রধান ড আবু দায়েন, অধ্যাপক ও প্রিয় কবি ড খালেদ হোসাইন, মেধাবী লেখক ড আবুল আজাদ এসেছেন। ইনারা তাঁকে ছেলের মত দেখেন। ড আবু দায়েন তাঁর ডক্টরাল সুপার ভাইজার ছিলেন। মেঘের ডক্টরাল থিসিস ছিল, ‘বিলুপ্ত আচিক লিপিঃ একটি সমীক্ষা’। সে থিসিস লেখার কাজ টা আর শেষ করতে পারে নি ঠিক, কিন্তু তাঁদের স্নেহ বঞ্চিত হয় নি তবুও। শিক্ষকরা বোধ করি এমনই হন। তাঁরা তাঁদের ছাত্রদের আজীবন ভালোবেসে যান, কখনও কখনো বিনা কারণেই।
প্রিয় বাংলা’র নেতা প্রিয়লাল দা, পুলি বউদি, জীবক বড়ুয়া, ফারহানা ম্যাডাম এবং হানিপ স্যারও এসেছেন। টাঙ্গাইল মধুপুরের ছেলে মেঘ। মধুপুরে রাজনৈতিক দল মত নির্বিশেষে তরুণেরা সবাই মিলে কাজ করছে ‘আলোকিত মধুপুর’ এবং ‘মধুপুরবাসী’ নামে দু’টো সংগঠনের ব্যানারে। দেশে একটা নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে মধুপুরের ছেলে – মেয়েরা। এদের দেখে যদি অন্য উপজেলা, জেলার তরুণেরা কিছু শিখত, বাংলাদেশ বদলে যেত। সত্যি বদলে যেত!



ঐ তরুণদের একজন সামিউল আলম। মেঘ তাকে খুব স্নেহ করে দাদু বলে ডাকে। মাঝে মাঝ ছেলেটির ডেডিকেশান দেখে ওকে মেঘ বলে, “তুই এমপি হলেও অন্তত মধুপুরের চেহারা আলাদা থাকত।” মেঘ ওকে সামিউল সুলতান এমপি বলেই ডাকে। এই সামিউল আলমও চলে এসেছে তার কম্পিউটার সেন্টারের কিছু কম্পিউটার বিক্রি করে! এই সামিউল মাঝে মাঝেই বলে, “দাদু, তুমি যদি এমপি খাড়াও, তাইলে আমি আমার ২০ শতাংশ জমি বেচে তোমার নমিনেশানের টাকা দিব! তুমি এমপি হইলে আমাদের মধুপুর-ধনবাড়ি একটা মডেল এলাকা হইত! আমি নিচ্চিত! আমাদের কপাল ডা খুব খারাপ। আমাদের মধুপুরে খালি বাইরের লোকজন এসে এমপি হন, মন্ত্রী হন। এরা মানুষ ভাল, কিন্তু এলাকার কোন উন্নয়নে এরা কাজে লাগে না। এঁদের ভালো মানুষী দিয়ে কি পেট ভরে? আমাদের লাভ টা কী?”

মেঘ বলে, “লাভ নাই ঠিক, কিন্তু ক্ষতিও হচ্ছে না। এঁদের জায়গায় একটা দুষ্টু গরু এসে পড়লে, গুতা খেতে খেতে তোমরাও আমার মত দেশ ছাড়া হয়ে যেতে! অন্তত হামলা, মামলার মধ্য দিয়ে তোমাদের যেতে হচ্ছে না। আর এখন যিনি আছেন, ড আব্দুর রাজ্জাক এমপি তো সজ্জন, বিদ্যান; তিনি তো বেশ ভাল মানুষ, কাজও কিন্তু খারাপ করছেন না, তাই না?”
“যাই বল দাদু, চোখে পড়ার মত, দেখাবার মত কিন্তু কোন কাজও নেই, আছে কি?” একটা দীর্ঘশ্বাস নিতে নিতে সামিউল বলে।



জাতি সংঘের এক কর্মকর্তা অনিন্দিতা শাহনাজ এসেছিলেন। মেঘের বন্ধু তিনিও। তিনি চিত্র শিল্পীও বটে। অপারেশান থিয়েটারে থাকায় তাঁর সাথে মেঘের আর দেখা হয় নি।
মেঘ শুনেছে বাংলাদেশের প্রায় সব মান্দি ডাক্তার এসেছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা উইলিয়াম ম্রং, ডা তাপস রেমা, ডা মুক্তি আরেং, ডা রুমা রুমঝুম ম্রং, ডা পল দারু, ডা খক্সি, ডা হিলারিউস, ডা সোমা হাপাং, ডা মৌসুমি অনুরাধা সাংমা, ডা পান্না ম্রং, ডা জিম্মিত দারু এসেছিলেম। ঐ দলের নেতা তার কলেজবেলার বন্ধু, রাজনীতিক ডা অনিসীম বিলিয়ম সাংমা। এছাড়া শেখ সেলিম, রফিক, দুর্জয়, সাত্তার, ফ্রান্স থেকে কবি লুই, ইংল্যান্ড থেকে টগর দেবনাথ, ডেনমার্ক থেকে রুবি রেবেকা আরেং, জাপান থেকে হারুন-উর- রশিদ, কানাডা থেকে ছেলেবেলার বন্ধু প্রশান্ত চিরান, ইঞ্জিনিয়ার লতিফ ভুঁইয়া, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জুয়েল রানা, ঢাকা থেকে অর্পা কুজুর এসে দেখে গেছেন যখন মেঘ সংজ্ঞাহীন ছিল।

মনে আছে, মেঘ যখন ঢাকা কারিতাস সেন্ট্রাল অফিসে ডেজিগ্ন্যাটেড এজুকেশান অফিসার ছিল, তখন দিনাজপুর কারিতাস পরিদর্শনে গিয়েছিল। সেখানেই অর্পাদির সাথে পরিচয়। বড় ভালো মেয়ে! ওর কথা মনে পড়তেই দিনাজপুরের রসমঞ্জরির কথা মনে পড়ল। অর্পাদি মেঘকে রসমঞ্জরি খাইয়েছিলেন। দিনাজপুরের ঐ রসমঞ্জরি কেবল ‘ঝান্ডুদা’র মিস্টির সাথেই তুলনা করা যেতে পারে। তুলনা করা যেতে পারে শুধুমাত্র টাঙ্গাইলের ‘পোড়াবাড়ির চমচম’ কিংবা ‘মুক্তাগাছার মন্ডার’ সাথে। মুক্তাগাছার মন্ডা’র বড় ইতিহাস আছে। এখানে না বলি?
ঢাকা কারিতাস সিডিআই এর সিনিয়র ফ্যাকাল্টি এখন অর্পাদি। প্রশান্ত চিরান তো এখনও প্রতিদিন একবার হলেও হাসপাতালে আসে। চুপচাপ আসে, চুপচাপ চোখ মুছে। বেচারি। ঘনিষট বন্ধু হবারও অনেক সুখ – দুঃখ থাকে। প্রশান্ত সেটা এখন ফীল করছে।



ডা অনিসীম ময়মনসিংহ ম্যাডিকেল কলেজের ভিপি ছিলেন। জাঁদরেল এই মেধাবী ছাত্র নেতা এখন একটি ল্যাপ্রোসি হাসপাতালে গরীব মানুষের চিকিৎসা সেবা দেন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে। সরকারী দলের ছাত্র নেতা হয়েও সে সরকার থেকে কোন সুবিধা নেয় নি, চিন্তাও করে নি কোনদিন। “দেশ তোমাকে কী দিয়েছে তা ভেবো না, বরং তুমি দেশকে কী দিয়েছ তাই ভেবো” এই কথা যেনো ডা বিলিয়ম হৃদয়ে ধারণ করে বসে আছে। আসলে এই ডা বিলিয়মের মত পাবলিকরাই পৃথিবীটা গুছিয়ে রাখে। আমরা তাঁদের পাগল ভাবি। ভাবি, কী বোকা! কী স্টুপিড!
আমাদের দেশে একজন রোগী মারা গেলেই হইচই পড়ে। রোগীর আত্মীয় স্বজন হুট করেই বলবে, “ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় আমাদের রোগী মারা গেল রে!” আর অমনি চারিপাশ থেকে শুরু হবে হুক্কা হুয়া; শুরু হবে ভাংচুর। ডাক্তারের গায়ে হাত, যেন নিত্যদিনের গল্প! কি অসভ্য, অকৃতজ্ঞ মানুষের দল আমরা। দেশ সেরা মেধাবীদের আমরা এই পেশায় পাঠাই আর কিল ঘুষি চালাই! একবার ভেবেও দেখি না, এঁরা না থাকলে হয় তো এই সুন্দর পৃথিবীটাই আমাদের দেখাই হতো না হয় ত! জীবনের পরতে পরতে এই ডাক্তারেরাই আমাদের সব থেকে কাছে থাকেন, ভরসার জায়গা হন না ফেরার দেশে যাত্রা করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। আর এঁদের সাথেই আমাদের সবচেয়ে কদর্য আচরণ টা করে থাকি! ভুলেও কেউ একবারের জন্যও ভাবেন না এই ডাক্তারেরাও মানুষ। কারো না কারোর বাবা-মা, ছেলে – মেয়ে, বন্ধু – স্বজন! বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষই যেন একেকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। আমরা ভুল চিকিৎসা খপ করে ধরে ফেলতে পারি! এই বিদ্যে টা আমাদের প্রাইমারী স্কুলেই শেখান হয়!

বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে সব মানুষের এক জায়গায় খুব কমন অভিযোগ দেখা যায়। আমরা প্রায়ই শুনি, “কটসন ইঞ্জেকশান দিয়ে ডাক্তার রোগী মেরে ফেলেছে!” কথা সত্যি! কারণ কটসন ‘অপ্সোনিন কোম্পানির একটা বহুল ব্যবহৃত ঔষধ। এই ইঞ্জেকশান মর মর রোগীকে দেয়া হয়। হাজার হাজার রোগীর জীবন বেঁচে যায় এই ইঞ্জেকশানে। দুই – চারজন মারাও যায়। জীবন বেঁচে গেলে কথা নেই, দুই একজন মরে গেলেই নিউজ, ভাংচুর!

কটসন এর মুল উপাদান হচ্ছে ‘হাইড্রোকরটিসন’ যা সাধারণত ইমারজেন্সীতে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত মর মর সব রোগীর ক্ষেত্রেই শেষ মুহূর্তে এটা প্রয়োগ করা হয়। এটা লাইফ সেভিং ঔষধ, এই ওষধ অনেক সময় শেষ চেষ্টা হিসেবেই দেওয়া হয়। এটা দেওয়ার পর রোগী বেঁচে গেলে কোন কথা নেই কিন্তু মরে গেলেই রোগীর আত্মীয় – স্বজন মনে করেন এই ইঞ্জেকশান দিয়েই ডাক্তার রোগী মেরে ফেলেছেন। এক শ্রেণীর কিছু সাংবাদিক তাঁরা এই সংবাদ লুফে নেন। তাছাড়া মারা যাওয়ার পর হাসপাতাল বিলের একটা ব্যাপার থাকে। একটা ভুল চিকিৎসার ধুয়া তুলতে পারলে সবারই লাভ। রোগী পক্ষের লাভ, পাতি নেতাদের লাভ, কিছু সাংবাদিক ভাইদের লাভ; লাভ আর লাভ! বিল তো দিতেই হয় না, উল্টো কিছু পাওয়া যায়! আর রোগী যখন মারা যায় তখন রোগীর আত্মীয় – স্বজন এত ইমোশনাল হয়ে পড়েন, তারা কোন যুক্তি শুনতে চান না; বিশেষ করে সাডেন ডেথ, অনাকাংখিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটা আর ও বেশি দেখা যায়।
ডাক্তারগণও ধুয়া তুলসি পাতা নন! আমাদের দেশের কিছু ডাক্তার রোগীদের সাথে ভাল আচরণ করেন না। তাঁদের জম্মের সময় মুখে মধু দেয়া হয় নি হয় তো ভুলে ভালে! তাঁরা রোগীদের যথাযথ সময় দেন না। রোগী এবং তাঁর বন্ধু – স্বজনের প্রতি সহানুভূতিশীলও নন তাঁরা। তাছাড়া কিছু ডাক্তারগণ নগদ টাকাও গ্রহণ করেন। ৫-১০ মিনিটেই ৪০০-৫০০ টাকা। জেলাসির একটা ব্যাপার তো থাকেই। আরও বহু কারণে ডাক্তারদের অনেক মানুষ দেখতে পারেন না। সব মিলিয়ে সুযোগ পেলেই সবাই সব উগরে দেন সব ডাক্তারদের উপর। এসব গ্যাপ ব্রিজিং করার দেশে কেউ নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় শুধু কোমল বানী দিয়ে চলেন। তাঁর চেলারা থাকেন ধান্ধায়। সমস্যা তাই কমে না, কেবলই বাড়ে!


শুনছি, দাবী উঠছে ভুল চিকিৎসার জন্য সংসদে আইন পাশ হবে খুব শীঘ্রই! ভাল কথা। কিন্তু এমন যদি হয়, সবাই ডাক্তারদের সেই আইনে মামলা ঠুকে দিল। ডাক্তারেরা কোর্টে কোর্টে হাজিরা দিলেন তাঁদের চিকিৎসা কাজ ফেলে। কেমন হবে? আবার ‘ভুল চিকিৎসার কারণেই রোগী মারা গেছে’ প্রমাণের আগেই যদি শাস্তিও হয়ে যায়? তখন কী হবে? মেঘ ভাবে আর ভাবে।

সব কিছু দেখে শোনে নিজেকে একটু বিশাল কিছু মনে হচ্ছে তার! ভি আই পি ভি আই পি-ই লাগছে নিজেকে! ‘এত ভালোবাসা কোথায় রাখি’, মনে হচ্ছে? ভালই হয়েছে দুর্ঘটনা টা হয়ে! তা না হলে জীবনে বুঝতেই পারত না, এত এত মানুষ ওকে ভালোবাসেন? হয় তো অনেকের সাথেই কোনদিন দেখাই হতো না আর! তবে বুকের ভেতর একটু জ্বলছে। অনেকে তাকে দেখে গেছেন যখন সে অচেতন ছিল। ইস! অনেক কে কাছে পেয়েও দেখে রাখতে পারল না! তার আফসোস তাকে ভেতরে ভেতরে পুড়াচ্ছে। এ যেন খাণ্ডব দাহন। এ দহন যেন হাত পা হারানোর কষ্ট থেকেও অনেক অনেক বেশি। ভালোবাসা এমনই। কেবলই পোড়ায়। যন্ত্রণা দেয়। কীসে, কোথায়, কখন, কেন বুঝা বড় দায়।
মনে মনে ভাবে, চনু কি জানে না এখনও সে হাসপাতালে? সে কি এসেছিল? ওর কথা মনে হওয়া মাত্র বুক টা হাহাকার করে উঠে। ও কি সহ্য করতে পারবে এ দৃশ্য? ভালোবাসার মানুষ টার হাত – পা কেটে ফেলতে হয়েছে এ খবর শুনলে সে কি মাথা ঠিক রাখতে পারবে? পারবে মনে হয়। সে অনেক দৃঢ়চেতার মেয়ে। ও পারবে। ঠিক পারবে। মেঘ আইফোনে হাত রাখে। ইউটিউবে গিয়ে তার প্রিয় একটি গান ছাড়ে …
‘শাওন রাতে যদি, স্মরণে আসে মোরে …’ [ গান টি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুনঃ https://www.youtube.com/watch?v=h-eZ0HLlGDo ]

মেঘ গান থামায়। বাংলাদেশ বেতারের গারোদের প্রোগ্রাম সাল্গিত্তাল’র মূখ্য প্রযোজক মাইকেল মৃত্যুঞ্জয় রেমা, এক সময়ের শিল্পী তুখোর মান্দি বেতার শিল্পী শান্তা মৃ, ভিন্সেন্ট চিসিম, অরবিন্দ সাংমা, তারা ন ক রে ক, ওস্তাদ নিশিকান্ত মাজি, মিহির মৃ স্যার, হেড মাস্টার অরুণ মৃ, পিরিন নকমা, হেড মাস্টার এপ্রিল পল মৃ, বাবুল সাংমা, ববিতা সাংমা, প্রিন্সিপাল সমরেন্দ্র রিছিল, আবৃত্তি শিল্পী লিজা ম্রং, বিপুল রিছিল, স্বপ্না চিসিম আরও কত প্রিয় মুখ আসে!
শান্তা দি লালমাটিয়া মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করতেন। ভিনসেন্ট চিসিম মেঘের জেঠাত ভাই। এই ভিনসেন্ট চিসিম আর অরবিন্দ সাংমা এক সময় নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার এর সালগিতাল প্রোগ্রামে গান করতেন। মেঘেরা তখন ছোট। তাঁদের কণ্ঠে রেডিও তে গারো গান শোনার জন্য তারা প্রহর গুনত। নতুন প্রজন্মের ছেলে – মেয়েরা কি এখন রেডিও শুনে? তাঁরা কি জানে, সালগিত্তাল নামে রেডিও তে গারোদের জন্য একটা আলাদা অনুষ্ঠান হয়? হয় তো জানেই না! হয় তো শুনেই না সে প্রোগ্রাম। এখন স্মার্ট ফোনের যুগ। হাতের মুঠোই সারা বিশ্ব! পৃথিবী কত দ্রুত বদলাচ্ছে। শুধু বদলাচ্ছে না মানুষের জিঘাংসা।
মেঘকে দেখতে এসেছেন কিছু বন্ধুরাও; কিছু পুরোন ছাত্র – ছাত্রীও আছে এদের দলে। মেঘ এদেশে আসার আগে প্রায় ১২ বছর অধ্যাপনা করেছে ৩ টি কলেজে, সাংবাদিকতাও করত পাশাপাশি। একটি টপ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় সহ – সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছে। তার পুরনো ছাত্রদের মধ্যে ঢাকা ম্যাডিক্যাল কলেজের ডাক্তার সুকদেব সাহা, ডা আহমেদ আবরার, ডা জিম্মিত দারু, চলচিত্র ও নাট্যশিল্পী রুহুল আমিন, জাঁদরেল ব্যবসায়ী এস কে সোহান, ইংল্যান্ডের টিভি সাংবাদিক ইব্রাহীম আদিত্য, লেখক জাহিদ কবীর হিমন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নীয়ামুল কবীর, শিক্ষক ও টিভি সাংবাদ উপস্থাপক নেয়াজুল কবীর, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং কবি হিমেল রিছিল, সেনাবাহিনীর ল্যাফটেন্যান্ট ইমরান সানি, এডিশনাল এ এস পি এ্যানি, কূটনীতিবিদ তানসেন আহমেদ, চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট কিশোর কুমার হালদার, আরেক চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট সৌহার্দ্য আহমেদ, তরুণ সংগঠক রেজা আহমেদসহ অনেকেই এসেছেন। কিশোর কুমার হালদার, রেজা আহমেদ, ইমরান সানি , সৌহার্দ্য আহমেদ মেঘের খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন।



সানি সেন্ট যোসেফ কলেজে মেঘের ছাত্র ছিলেন। খুব স্মার্ট এবং মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। সব কিছুতেই তিনি ছিলেন নেতা, অগ্রজ। কলেজে থাকতেই তিনি মেঘকে বলেছিলেন, “স্যার, আমি আর্মির কমান্ডিং অফিসার হব। দেশ ও জাতির সেবা করব। দেশ ও পৃথিবীর কল্যাণের জন্য যদি জীবন দেয়া লাগে, আমি হাসিমুখে তা করব। আর সেনাবাহিনীর প্রধান যদি হতে পারি কোনদিন, প্রথমেই আপনার বাসায় আসব এবং একটা কড়া স্যালুট দেব।” মেঘ বলেছিল, “তুমি তা করতে পারবে না। তুমি তখন দেশের সার্বভৌমত্বকে রিপ্রেজেন্ট করবে। অনেক নিয়ম কানুনের বেড়াজালে থাকবে। তোমাকে কত প্রটোকল মেনে চলতে হবে। ইচ্ছে করলেই তুমি তা পারবে না। আমিও চাইব না আমার ছাত্র নিয়ম ভাঙবে। আমি নিয়ম ভাঙার পক্ষে না কোনদিন। তবে নিয়ম যেন মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায় সেদিকে আমি সজাগ থাকি। সজাগ থাকা উচিত তোমাদেরও। কিন্তু আমরা তো মানুষ, আমাদের ঘুম চলে আসে! মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়ম, নিয়মের জন্য মানুষ নয়!” মজার কথা হল, মানুষ হয়ে এঁরা তাঁদের শিক্ষককে ভুলে যান নি। এসব ভেবে মেঘ স্বস্তি পায়।

তাসলিমা আহমেদ এ্যানি আর তানসেন এখন নিউ ইয়র্কেই থাকবেন আগামী ৪ বছর। উচ্চ শিক্ষার জন্য দু’জনেই এসেছেন। এদের সাথেই এসেছেন ওর একজন ইয়ার মেট, বন্ধু। কবিতা -গান- গল্প লিখেন। ওর নাম বচন ন ক রে ক। খুব ভাল কবিতা লিখেন। ওর মামাও হন। তিনি বার বার বলছেন, “বাম হাত টা কেটে ফেলতে হলে problem ছিলো না! তোর তো ডান হাতটা গেছে। খোদায় হাত নিয়েছে, বা হাত নিত, ডান হাত নিল ক্যান? আর তো গান – কবিতা – গল্প লিখতে পারবি না! যে কবি, সে কবিতা না লিখতে পারলে বাঁচবে কেমন করে?” মেঘ ফিক করে একটা হাসি দিল। ওমনি বচন ধমকের সুরে বললেন,”হাসির কি বললাম? হাত – পা না থাকা কি জিনিষ, বুঝিস?” মেঘ খুব জোরে হেসে বলল, “মায়ের থেকে মাসির দরদ দেখছি বেশি। আমি বা হাতেও তো লিখতে পারি!”

মধুপুরে গারো আদিবাসীদের ইকো – পার্ক বিরোধী আন্দোলনে দাঁত হারানো মেঘের সাবেক ছাত্র অন্তর মানখিন এসেছে। এসেছে শুভজিৎ সাংমা, প্রাজল নকরেক, সৃজন নকরেক, মনিকা মঞ্জরি দ্রং, মিলকা সাংমা আর তাদের বান্ধবীরাও। ওদের দেখে ওর সব কষ্ট দুঃখ যেন নাই হয়ে গেল।
মধুপুরের ইকো -পার্ক বিরোধী আন্দোলনের প্রথম দিকে মেঘ তার বন্ধু প্রশান্ত চিরান, রজতি চিরান, রেখা ন ক রে ক, ছোট্ট মেয়ে তন্দ্রা দালদত গারোদের সংগঠিত করেছিল। তাঁদের ছোট সংগঠন আজিয়া’র ব্যানারে রজতি চিরান আর রেখা ন ক রে ক এর নেতৃত্বে জলছত্র কারিতাস সিল্কের এর সামনে অনেক সাহস নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল। মানব বন্ধন করে কালো পতাকা দেখিয়েছিল ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতকে।

আসলে মধুপুরের গারোদের লড়াই – সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। এগুলো বলতে গেলে শুরু করতে হবে ১৯৬২ সাল থেকে। জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে, কাটা তার দিয়ে বেড়া দিয়ে গারোদের উচ্ছেদ করে তদানীন্তন পাক সরকার ফুলবাগচালা নামে একটা চিড়িয়াখানায় রাখতে চেয়েছিল। গারো রাজা পরেশ চন্দ্র মৃঃ তখন এর প্রতিবাদ করে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ নামে একটি সংগঠনের গোড়াপত্তন করেন।

সে যাই হোক, লড়াই – সংগ্রাম – আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারনে মধুপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ এর অধ্যাপনা থেকে বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করতে হয় মেঘকে।
কী ছিলো এই ইকো -পার্ক প্রকল্পে?

তৎকালীন বি এন পি সরকার মধুপুরে ‘less productive’ শাল গাছ কেটে, সাফ করে, বিদেশি গাছ আকাশ মনি, মেহগনি, ইউক্যালিপ্টাস লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মধুপুরের গারোদের জীবন – জীবিকা, কৃষ্টি – সংস্কৃতি বনের উপর অনেক খানি নির্ভরশীল। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রাকৃতিক বনে শত প্রজাতির গাছ, লতা-গুল্ম থাকে। শত প্রাণবৈচিত্র্য চোখের সামনে ধংশ হয়ে যাবে তা আদিবাসীরা মেনে নেয় না। প্রতিবাদ করে। তাঁদের মৌন শোভাযাত্রায় বন রক্ষী, পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। পীরেন স্নাল ঘটনা স্থলেই প্রাণ হারান, চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান উৎপল নকরেক, গুলিবিদ্ধ হয় শ্যামল চিরান সহ অর্ধশতাধিক নারী – শিশু। জেল খাটেন আদিবাসী নেতা অজয় এ মৃঃ, প্রশান্ত মানখিন, মাইকেল ন করেক এবং আরও দু’জন প্রাইমারী স্কুল শিশু।
বি এন পি খুব খারাপ? খুব খারাপ! কিন্তু এই প্রকল্প টা তৈরী হয়েছিল আওয়ামীলীগের আমলেই! অবিশ্বাস্য, তাই না? আসলে বি এন পি আর আওয়ামীলীগ যেই ক্ষমতায় আসুক, কেউ আদিবাসীদের কথা ভাবেন না। আদিবাসীরা গণতন্ত্রের পূজা করে কেবল ভোট দিয়ে যায় আর সরকার বানিয়ে নিয়ে আসে তাঁদের গুতা খাওয়ার জন্য। এ এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। চলতে থাকে, চলতেই থাকে। এরপর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া চলেশ রিছিল, স্কুল হেড মিস্ট্রেস বাসন্তী মাংসাং রা এক এক খুন হয়ে যান। সম্মূখ সারির নেতারা মামলার পর মামলায় ডুবে যায়। তাঁরা তাঁদের জমি, বাডি ভিটা বেঁচে মামলা চালায়। লড়াই – সংগ্রাম চালিয়ে যায়।মেঘের মত কিছু স্বার্থপরেরা দেশ ছাড়ে! আদিবাসীদের কান্নার সাত রঙ পৃথিবীর কেউ দেখতে পায় না। বোধ করি ঈশ্বরও না।
তবুও ওরা হিদয়ে ধারণ করে জন থুসিনের কালজয়ী গান, যে গানে একজন গারো আদিবাসী মা তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে যাবার নির্দেশনা, যুদ্ধকৌশল শেখান। আদিবাসী মা জানেন সংগ্রাম করেই বাঁচতে হবে এই পৃথিবীতে! তাই তিনি ছেলেকে শোনান – দিং দিং আফফাদে দিং দিং, দিং দিং চালানদে দিং দিং। [গানটি শোনার জন্য ক্লিক করুন এখানে – https://soundcloud.com/swatee-ritchil/ding-dingmp3 ]



রুগা রঞ্জিত মৃঃ ওর পিসির ছেলে। মেঘ সারা জীবন তাঁকে শুধু হাসতে দেখেছে। দুঃখে – কষ্টে – বিপদে – সংকটে কোন দিন তাঁকে চিন্তিত হতে দেখে নি। ২০০৭ সালে মেঘ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপার্টমেন্ট অব স্ট্যাট’ এর স্কলারশীপ পেয়ে ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসবে যখন, ঠিক তার কদিন আগে মেঘকে সংসদ ভবনের সামনে থেকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেল। চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে বেদম মারপিট করল। মেঘ বলল, “ভাইয়েরা, তোমরা আসলে কী চাও? আমাকে মারছ কেন?”
– চুপ কুত্তার বাচ্চা! তোর জান চাই, জান। একটা কথা বলবি না, খানকির পোলা বলে খেখিয়ে উঠে…
– ভাই, সব নিয়ে যান। আমি তো দিতে চাইছি সব। বলেন কী কী চান! পিটান কেন?
– মাঙ্কির পুত। বেশি নেতাগিরি চুদাও সব খানে, না? তোর বালের নেতাগিরি আজ সব ছুটাই দিব। একটা কথা বলবি না। ফুটা করি ফেলব। বান্দির বাচ্চা …
আরও কত অদ্ভূত, অশ্লীল গালি শুনতে হয় মেঘকে। তারা নন স্টপ কিল, ঘুষি দিয়ে চলে। মেঘ চিৎকার করে মানুষের সাহায্য চায়। হাজার হাজার মানুষ চেয়ে চেয়ে তামশা দেখে! এরা সব শাড়ি – চুড়ি পড়া পুরুষ মানুষ! এদের মেরুদন্ড নেই। কিন্তু বড় বড় কথা বলার মানুষের অভাব নেই। আমাদের দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মুরোদ কম মানুষের আছে। সাহায্য চিৎকারে কিল ঘুষির ওজন বেড়ে চলে। সামনে ‘র‍্যাব’ এর গাড়ি দেখতে পেয়ে একটু বাড়তি আশা নিয়ে সর্ব শক্তি নিয়ে চিৎকার করে মেঘ, ‘বাঁচান! বাঁচান! আমাকে বাঁচান স্যার, আমাকে মেরে ফেলল, স্যার!” র‍্যাব এর কিছু সদস্য মুখ তুলে চেয়েও কি ভেবে আবার মুখ ফিরিয়ে নেন! মেঘ এবার বুঝল, আজই তার কিয়ামতের দিন। সে তার মা মারিয়া’কে ডাকে, যিশুকে ডাকে, ঈশ্বরকে ডাকে। শেষতক আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান সবাইকে ডাকে। তাঁর ডাক চিৎকার, বাঁচার করুণ আকুতি ভগবানের কানেও পৌঁছে না। বাংলাদেশে হয় তো ভগবানও নেই। সে ভাবে।


মনে হয় পুরো ঢাকা শহর ঘুরছে ছিনতাইকারীর গাড়ীটি! এর আগে ঢাকা শহরে, কত ছিনতাইকারী ধরে উত্তম – মধ্যম দেওয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে মেঘ! আজ বুঝি তার সুদে – আসলে মিটিয়ে দিচ্ছে বেটারা! সে একবার ভাবল, মরবেই যখন, সেও একবার চেষ্টা করে দেখবে। চোখ বাঁধা, কিছুই দেখা যায় না। থুথনির নিচে ধরা পিস্তল টা আসল, না নকল বুঝার কোন উপায় কিংবা সুযোগ পাচ্ছে না সে। তবুও শেষ সিদ্ধান্ত, মরবেই যখন ফাইট করে দেখবে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর না।
সে বুঝতে পারে মহাখালি ‘ফ্লাই ওভার ব্রীজ’ এর উপর দিয়ে গাড়ি এসে থেমেছে।বুঝে উঠার আগেই হায়েনার দল তাকে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দেয়! কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ তার এবার হাত টেনে ধরেন! সে পিলার ধরে ঝুলে থাকে। দুই কপোত – কপোতি এগিয়ে এসে তাকে টেনে তোলেন। এরা হয় তো যিশু কিংবা মারীয়া’র দূত! অলৌকিক ভাবে এ যাত্রায় বেঁচে যায় মেঘ।
ওরা তাকে ফার্মগেটগামী দোতলা বাসে তুলে দেয়। মেঘ ‘শালামার’ বারের সামনে নামে। ওর মাথা চক্কর দেয়। লোহার রড ধরে দাঁড়ায়। ‘নিলয়’ নামের এক ছাত্র তাকে এত রাতে ‘বারের সামনে দেখে’ মনে করে ‘স্যার! স্যার এত রাতে বারে খেয়ে-নেয়ে ঢুলছে!’ সে সালাম দেওয়ারও সাহস পায় না। কেটে পড়তে চায়। আবার ভাবে, “এ হতেই পারে না, স্যারের মনে হয় বিপদ।’ কাছে গিয়ে নীচু গলায় বলে, ‘স্লামালিকুম স্যার, আপনি কি মেঘ স্যার? মাথা ঘুরাচ্ছে স্যার? আপনাকে একটু ধরব স্যার?” মেঘ শুধু বলতে পারে, ‘ছিনতাইকারী …
নিলয় একজন সেনাবাহিনীর মেজরের ছেলে। সে মেঘকে তাদের বাসায় নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। মেঘের পিসির ছেলে রঞ্জিত রুগাকে ফোন করে জানায়, “মেঘ স্যারকে সন্ত্রাসীরা …… আপনি আমাদের বাসায় এক্ষুনি চলে আসুন।”



ভয়, আতংক কোনটাই মেঘের আর কাটে না। কোন মানুষ দেখলেই ভয় পাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি জানোয়ারের দল চুরি-পিস্তল ঠেকিয়ে আবার কিল ঘুষি দেয়া শুরু করবে এক্ষুণি! কি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা এখন তার। একটা সিনেমার স্যুটিং হয়ে গেল যেনো। মেঘ ভাবে, কেন, কারা তাকে এভাবে শেষ করতে চায়? কি তার অপরাধ? এটা কি শুধুই ছিনতাইয়ের ঘটনা? সব দিয়ে দেবার পরও কেন ওরা তাকে কেন এত কিল, ঘুষি দিল? কেন ফ্লাইওভার থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলতে চাইল? কেন?

রঞ্জিত রুগা আসেন। হাসপাতালে নিতে চান, পুলিশের কাছে যেতে চান। কিন্তু মেঘ তা চায় না। ক’দিন পরে তার পড়াশুনার জন্য আমেরিকা যাত্রা। এসব থানা পুলিশ, হাস্পাতাল করে সে তার স্কলারশীপ টা হারাতে চায় না। লাভ কী থানা পুলিশ করে এ দেশে? পুলিশ আক্রান্ত মানুষকেই আরও হয়রানি করবে, সুযোগ পেলে আরও কিছু টাকা খসাবে। এদের চরিত্র কি, মুখস্ত নয়? এঁদের কিছু ‘ভাল পুলিশ’ হয় তো ভাল কিছু করতে চায়, তাহসিন মাসরুফ হোসেন মাশফি’র মত পুলিশ অফিসারও হয় তো দেশে আছে। কিন্তু ভাল কাজের জন্য তাঁদের ঠিকানা হয় বান্দরবন, নয় তো জাপান। অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী’র আগের স্বামী আসাদ ভাইও ছিলেন সৎ পুলিশ অফিসার। চিন্তাইকারীদের হাতেই তিনি খুন হন। আসলেই কী তিনি ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছিলেন? নাকি তাঁকে পুলিশ বিভাগই খুন করিয়েছেন? দেশের মানুষ তো এর কোন প্রতিবাদ করে নি। একদিন হয় তো সৎ পুলিশ অফিসার সিনিয়র এ এস পি মাসরুফ হোসেনও দেশে ফিরে আসবেন। আবার মানব সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়বেন, হয় তো কে জানে তিনিও খুন হয়ে যাবেন। দেশের মানুষ হা করে তামশা দেখবেন। বলবেন, “ইস! উস! আস! মাসরুফ হোসেন, বড় সাহসী পুলিশ অফিসার ছিলেন!” নয় তো বা এসপি বাবুলের মত নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর খুনের দায় নিয়ে নীরবে পদত্যাগ করার নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাটবেন! আর দেশের নপুংসক অনেক শাড়ি-চুড়ি পড়া পুরুষেরা প্রথম আলো হাতে নিয়ে মজাদার খবর মুখস্ত করার কাজেই ব্যস্ত থাকবেন।

ফিরে আসার সময় নিলয়কে ডেকে মেঘ বলে, ‘ধন্যবাদ নিলয়!’ নিলয় বলে, ‘ছি ছি কী বলেন স্যার!’ মেঘ হাসে আর আসতে করে কানে কানে ফিস ফিস করে বলে, “নিলয় আমি জানি তুমি না জেনেই কিংবা অজান্তেই বলেছ, ‘স্লামালেকুম’ এর মানে ‘ আপনার ধ্বংস হোক’ তাই না?” নিলয় মাথা নিচু করে বলে, “জি স্যার, আর কোনদিন ভুল হবে না! এখন থেকে সব সময়ই বলব, ‘আস -সালাম-আলাইকুম!’

‘আস -সালাম-আলাইকুম!’ মানে ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক’। আমরা তা জেনেও কেন বলি ‘স্লামালেকুম?’
শিক্ষকদের এই একটাই দোষ, মারা যাবার আগেও তাঁরা উপদেশ দেন! এই যেমন মেঘের বড় নানা রাগেন ন ক রে ক প্রাইমারীর শিক্ষক ছিলেন দীর্ঘ ৩৫ বছর, ঠিক মারা যাবার আগেও মেঘ আর তার বন্ধুকে বলছিলেন, ‘তোমরা জান Robert Frost সব থেকে বাস্তববাদি কবি? …আয়ায়ায়ায়া… অহোহো… উহুহুহুহু… মনে রাখবি Robert Frost এর জীবনমুখি কবিতার লাইনগুলো … আয়ায়ায়ায়া…
“ The woods are lovely, dark and deep,
But I have promises to keep,
And miles to go before I sleep,
And miles to go before I sleep. ”
মনে রাখবা, বন্ধুরা এমনই …
“ One is alone, and he dies more alone.
Friends make pretense of following to the grave,
But before one is in it, their minds are turned
And making the best of their way back to life
And living people, and things they understand.
But the world’s evil. I won’t have grief so
If I can change it. Oh, I won’t, I won’t!’’
কবিতার লাইন বলতে বলতে মেঘের বড় নানা না ফেরার দেশে চলে গেলেন। হয় তো এখনও তিনি ‘চিকমাং’ পাহাড়ে গিয়ে অনেককেই এইসব কবিতার লাইন শোনান, কে জানে?
মরে যাচ্ছে, আর পারছে না যন্ত্রণায়, তবুও তাঁদের জ্ঞান বিতরণে কার্পণ্য নেই!
যা বলছিলাম, কত কঠিন পরিস্থিতিতেও রঞ্জিত রুগা স্থির ছিলেন। কিন্তু এই প্রথম তাঁকে দেখল গভীরভাবে চিন্তিত। কপালে সারাক্ষণ ভাঁজ পড়তে দেখল। তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “মসা, চিন্তা করোনা, এটা কিছুই না। ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন। ঐ যে রাজার গল্প টা মনে আছে?”
– মেঘ মুখ তোলে বলল, ‘কোন রাজার গল্প টা, মসা?’
– ক্যান, মনে নেই তুমি যে আমার মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের বাসার ছাঁদে বসে এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে ‘ঠাণ্ডা চা’য়ে চুমুক দিতে দিতে আমাদের শাহীজ বিউটি পার্লারের মেয়েদের একজন রাজা আর তার চাকরের গল্প বলেছিলে? এক রাজার চাকর সব সময় বলতেন, “ঈশ্বর যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন।’ একদিন বনে হরিণ শিকারে গিয়ে বাঘের থাবায় রাজা তাঁর একটা আঙুল হারালে সেই চাকরটি বললেন, ‘ঈশ্বর যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন!’ এতে রাজা ক্ষেপে গিয়ে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন।
– গল্পটি মনে পড়ল তার। তবুও বললে, আমার মনে পড়ছে না মসা। তারপর কী হল?
– তারপর? রাজা আবার শিকারে বের হলেন এবং সে যাত্রায় বন মানুষের কাছে বন্দি হলেন। তারা রাজাকে তাদের দলনেতার কাছে নিয়ে গেলেন। দলনেতা বললেন, ‘একে আমাদের দেবতার জন্য উৎসর্গ করা হোক!’ তখন ওদের একজন বলে উঠল, ‘হুজুর, এই লোকের একটা আঙুল নেই!’ দলনেতা বললেন, ‘আঙুল নেই? দেবতার আরাধনা অসম্পূরনাংগ মানুষ দিয়ে হবে না, একে ছেড়ে দাও।’ রাজা ঐ যাত্রায় বেঁচে গিয়ে তাঁর প্রাসাদে ফিরে বললেন, ‘কারাগারের ঐ লোকটাকে বের করে নিয়ে এসো!’
– তারপর?
– তারপর ঐ চাকরটিকে বললেন, “ঈশ্বর যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন বুঝলাম এবার! তা তোমাকে কারাগারে রেখে তোমার ঈশ্বর কী মঙ্গল সাধন করলেন?’ চাকরটি জবাব দিলেন, “মহারাজ, আপনি আমাকে কারাগারে বন্দি না করলে, ঐদিন আপনার সাথে আমিও শিকারে যেতাম আর আপনার জায়গায় আমার …।”
– এবার মেঘ বললেন, “মনে পড়েছে মসা।’’
মেঘ দেখলেন, যে লোক কোনদিন এক সেকেন্ডের জন্য হাসি থামান নি, সেই রঞ্জিত রুগা নীরবে চোখ মুছছেন। তাঁর প্রিয় তুলি মাসি বার বার উপরের দিকে তাকিয়ে চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। শেষে আড়াল করতে না পেরে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
ওঁদের কান্ড দেখে সে আবারও বাচ্চাদের মত ফিক করে হেসে উঠে।



মেঘ দেখল বচন মামাও ‘সুসেত – বাকসেত’ করে কাঁদছেন! তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “তুই চুপ করবি?” তারপর বাচ্চা ছেলের মত কাঁদলেন! বচন মামাকে নন – স্টপ চোখের জল ফেলতে দেখে পরক্ষণে বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস আর অসম্ভব কষ্ট বেরিয়ে এলো, যেনো ভেতর থেকে আত্মা বেরিয়ে গেলো! মানুষ কষ্টের মধ্যে যখন থাকে, যন্ত্রণা তাকে চেপে ধরে আরও বেশি করে। আশে পাশের মানুষেরা যখন আরও হা হুতাশ শুরু করে তখন যন্ত্রনায় দগ্ধ হওয়া মানুষটা আপ্রাণ চেষ্টা তার কিছুই হয় নি ভাব করার। কারণ সে অন্যকে তার মত কষ্ট পেতে দিতে চায় না, বুঝতে দিতে চায় না তার বুকে আকাশ সমান শূণ্যতা ভর করেছে। সে বুঝতে দিতে চায় না তার সমুদ্র সমান হতাশা তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। কিছু নির্বোধ মানুষ অবশ্য হা হুতাশ করে অন্যদেরও নৈরাশ্যের মধ্য ফেলে দেয়। মেঘ নিজেকে সেই কিছু মানুষের দলে ফেলতে চাইলে না!

কবি ফিডেল ডি’ সাংমা মেঘের সম্পর্কে দুলাভাই। খুব রাগ – অভিমান করে বসে আছেন ওর সাথে। ভাবছিল তিনি তাকে দেখতে আসবেন না। কিন্তু আসলেন। বা হাতে হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বের করতেই তিনি বললেন,” আমি বা হাতে হ্যান্ডশেক করি না!” মেঘ তার অর্ধেক ডান হাত টা বাড়াল। তাঁর কাটা অর্ধেক হাত দেখে তিনি মুচকি হাসলেন মনে হল! পা টা বের করে দেখাতেই তিনি পিচ্ছিদের মত হাউ মাউ করে কাঁদলেন। উপস্থিত সবাই চোখ মুছামুছি শুরু করে দিলেন। মেঘের চোখেও জল এসে গেল …

আসলে, মেঘ এক্সিডেন্ট করেছে তা প্রায় সবাই জানেন এখন। কিন্তু হাত – পা কেটে ফেলতে হয়েছে তা কেউ জানেন না। তাছাড়া প্রিয়জনকে হাত – পা বিহীন অবস্থায় কে দেখতে চান? মেঘ সবার কষ্ট বুঝে। অনুভব করে ওদের কষ্ট।

নার্স এসে বললেন, “Mr Megh, how do you feel today? I hope it’s better, right? You have some more guests in the waiting room ! Only two guests, sorry to say, can visit you at a time. Unfortunately, your guests are not complying with rules! Same rules are applicable even for Mr. President here. And we are sorry to say, it’s too much! Too much guests, we cannot allow anymore after today!” (Mr. Megh, আজ কেমন বোধ করছেন? আগের থেকে একটু ভালো, তাই না? আরো কিছু গেস্ট আসছে আপনার। আমাদের এখানে দুজনের বেশি এক সাথে দেখা করার নিয়ম নেই! আপনার গেস্ট রা এগুলো মানছেন না, একই নিয়ম এই দেশে প্রেসিডেন্ট এর জন্যও প্রযোজ্য। আর আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, অতিরিক্ত, ভয়াবহ অতিরিক্ত মানুষ আসছে আপনাকে দেখতে; আজকের পর আমাদের আর সম্ভব হবে না এত লোক দেখা অরার অনুমতি দেয়া! দুঃখিত! “) তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “Please let visit the ladies!” (আপনারা এখন আসুন, এবার ভদ্র মহিলারা দেখা করবেন!”) কেমন ঠাস ঠাস করে কথাগুলো বলে ফেলে হৃদয়হীনার মত!

[ Reaction of a reader: “I don’t know what I should say. But my tears insist me to allow him to come out from my eyes. Finally I couldn’t stop him. Now my heart insists me not to put sympathy but thanks you to carry such strong passion and confidence to lead the rest of life. Anyway, God is always with us I believe.”
– A KM Alamgir, Associate Professor, Eastern University.]

সাত
চন্দনা ফুল নিয়ে মেঘের কেবিনে ঢুকল! মেঘ একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “তুই এসেছিস? বস। তোকে কে বলল আমি হাসপাতালে?”

চন্দনা কোন উত্তর করলে না। শুধু একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললে, “একটু দেখে শুনে গাড়ি চালাতে পারিস না? এতগুলো ছেলে-মেয়ে তোর! আমি জানতাম তুই এ রকম একটা কান্ড ঘটাবি! তোর ভেতরে কবে একটা স্থিরতা আসবে, বল তো?”
মেঘ কাটা হাত আর কাটা পা চন্দনাকে দেখিয়ে বললে, “চন্দনা, আমার মনে হয় সব শেষ হয়ে গেছে! আমার আর দেশে ফেরা হবে না। নির্বাচন করা হবে না। আমার দল আর আমাকে নমিনেশান দিবে না। তুমিও মনে হয় আর আমাকে আগের মত…”


চন্দনা ওর মুখে বিদ্যুত গতিতে তার ডান হাত চাপা দিয়ে বললে, “চুপ কর! আমি কারোর হাত আর পায়ের দিকে তাকিয়ে, কাউকে ভালোবাসি নি! আমি, আমরা কি মরে গেছি। তোর চার ছেলে-মেয়ের ১৬ টা হাত -পা আছে। তোর চন্দনা কি মরে গেছে? হাত – পা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে না? পৃথিবীতে কত মানুষের হাত পা নেই। তাঁরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকে? স্টিফেন হকিং কী পৃথিবীর পরাক্রমশালী ব্যক্তি নন? এজন্য কি তার হাত পা সচল থাকা লাগছে? আমাদের দেশে দু’ টো পা নেই এমন মানুষ জালাল সাহেব কি সংসদে যান নি? তাঁদের কি ভালোবাসার অভাব ছিল? ওরা কি খেতে পড়তে পারে না? ওদের বন্ধু – স্বজন কি ওদের ফেলে চলে যায়?”

চন্দনা এক সাথে গরগর করে এতগুলো কথা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল! সাথে সাথে মনে হল, ওর বুকের পাহাড় সমান ভার নিমিষে সরে গেল। চন্দনার এই গুণটাই তার খুব ভালোলাগে। বিপদে সে মাথা খুব ঠাণ্ডা রাখে। যত কঠিন সময় আসবে, তত সে দৃঢ় হবে। কোন দুঃখ – কষ্টে সে টলে না। বিপদে – সংকটে থাকে অবিচল। কোন না পাওয়ার বেদনা যেন তাকে স্পর্শ করতে পারে না। হয় তো করে, কিন্তু অনেকের মত হা – হুতাশ করে সবাইকে জানায় না! সে মানুষের সাফল্যে আনন্দে উদ্বেলিত হয়, সীমাহীন কষ্টে সমব্যথী হয়, নৈরাশ্যে অপার উৎসাহ যোগায়। আমাদের সমাজের মানুষের চরিত্র এখন উল্টো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। তাঁরা মানুষের আনন্দে – সাফল্যে কাঁদে, পরশ্রীকাতর হয়ে উঠে বন্ধুদের সাফল্যেও। মানুষের বিপদে কেউ গোপনে, কেউবা প্রকাশ্যেই দাঁত কেলীয়ে হাসে। কি নির্লজ্জ চরিত্র আমাদের! চন্দনাদির যে গুণ, মানুষকে এই গুণগুলো শেখার জন্যই স্কুল – কলেজ – বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু আমাদের স্কুল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের এগুলো শেখাতে পারে না। এগুলো শুধুমাত্র কাগুজে সার্টিফিকেট বিলি করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ এখন কেমন দিন দিন মৌমাছির চরিত্র হারিয়ে ফেলছে। যে মৌমাছি নর্দমা, নোংরা কাদাজল থেকেই মধু সংগ্রহ করে, আমরা ওদের মত আর নই! মানুষ আগে তাই করত। তাই করে করে আজকের এই সভ্যতায় আমরা পৌঁছেছিলাম। এখন আবার আমরা আবার পেছনে হাটা শুরু করেছি! অনেক টা ‘সফটওয়্যার ডেভেলপম্যান্ট লাইফ সাইকেল’এর মত! মানুষ এখন মাকড়সার মত ফুল থেকেও বিষ সংগ্রহ করার কসরত রপ্ত করে ফেলছে!
এসব কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভাবে মেঘ! তারপর চোখভরা কথা নিয়ে চন্দনার দিকে তাকায়। কী যেনো সে বলতে চেয়েছিল চন্দনাকে, সে ভুলেই গেল! আর চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না। মেঘ বলে, চন্দনা, ‘এখানে এখন কেউ নেই! একটা গান শোনাবি?’
চন্দনা শুরু করে …
‘ মানুষ মানুষের জন্য … [ মানুষ মানুষের জন্য : https://soundcloud.com/shafiq-9/manus-manuser-janya-banglamus ]

গান গাইতে গাইতে চন্দনার গলা ধরে আসে, ক’ফোটা চোখের তপ্ত জল যুক্তরাষ্ট্রের মাটি স্পর্শ করে।
গলার স্বর নিচু করে ডাকে, ‘‘চনু, তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে, না? ‘আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কী গেছে? কিছুই কি আর নেই বাকী?’ মাঝে মাঝে মনে হয়, আসলে কিছুই হয় নি। আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, সব শেষ হয়ে গেছে! তোর কী মনে হয়, আমরা কি সামলে উঠতে পারব?’’ চন্দনার ডাক নাম চনু। চনু মুচকি হাসি দিয়ে বললে, “আমাদের দিন খারাপ যাবে না শনু, তুই একটুও সাহস হারাবি না। আমি আছি না? আমি আছি ত পাশে!”


মেঘ মনের অজান্তে চন্দনার ডান হাত টা বা হাতে চেপে বুকের কাছে রাখতে রাখতে বলল, “চনু, তুই অসম্ভব ভালো সঙ্গী। তুই আমার মনের মতোন একজন বন্ধু। তোকে আমি ভয়াবহ পছন্দ করি। অসম্ভব ভালোবাসি। তুই জানিস, তুই কত ভাল একটা মেয়ে? তুই পাশে থাকলে আমি ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ-উত্তাল-সাত-সমুদ্র-জীবন-সাগর সাতরে পাড়ি দিতে পারি। আমার চারটা হাত পা না থাকলেও! বুঝতে পারিস?”


চন্দনা তার প্রশ্নের জবাব দিলে না। অনেক টা না শোনার মত ওর দিকে তাকালে। কিছু বলতে চাইছে, ভাবলে মেঘ। কিন্তু না। চন্দনা এবার নিজের ঠোঁট দু’টো কামড়ে হু হু করে কেঁদে উঠলে! মেঘ তাকে বুকে টেনে নিতেই এলার্ম ক্লকটা চিৎকার দিয়ে উঠল! টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখে, একুশ বছর আগে তাঁদের কলেজবেলায় জলছত্রের শান্তি নিকেতনে তোলা চন্দনা আর শূণ্যমেঘের ছবিটা ফ্রেমের মধ্যে হাসছে!
Special thanks to Doctors: Rajesh Das Biliom A. Sangma Md Selim Uddin & Tazkia Isaba
Valolagle share korte paren….

এই লেখকের আরো গল্প পড়তে চাইলে ক্লিক করুন, নিচের লিংকগুলোতেঃ
To read more short stories of the writer, click the links:

১) স্বপ্নফেরিঃ https://www.facebook.com/notes/426457620743409/
২) আমার বন্ধু নীরাঃ https://www.facebook.com/notes/578362688886234/
৩) দ-হ-নঃ https://www.facebook.com/notes/babul-d-nokrek/%E0%A6%A6-%E0%A6%B9-%E0%A6%A8-%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F-%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA/415012101887961
৪) বন্ধনঃ https://www.facebook.com/notes/503664253022745/
লেখকের অন্যান্য লেখাঃ
১) গারো সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্যঃ http://www.achiknews24.com/%E0%A6%AE%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A6%A3/%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8B-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4-%E0%A6%B8%E0%A7%8C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6/
২) স্বাধীন গারো রাজ্যের গল্পঃ http://www.achiknews24.com/%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BF/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8B-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D/

৩) প্রিয় আদিবাসী মেয়েঃ http://www.achiknews24.com/%E0%A6%AE%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A6%A3/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%80-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%A4/
৪) ফ্রীল্যান্সিং বদলে দেয় জীবনঃ http://www.achiknews24.com/%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0/%E0%A6%AB%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%82-%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0/
৫) বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিঃ http://babulnokrek100.blogspot.com/2013/05/posted-august-23-2011-www.html
৬) আমার দেখা একজন সাদা মানুষঃ https://www.facebook.com/notes/babul-d-nokrek/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7-/605298756192627

আরও পড়তে চাইলে, টাকা দিয়ে বই কিনুনঃ লোল!

আরও পড়তে চাইলে, টাকা দিয়ে বই কিনুনঃ লোল!
৬) সাঁজশিল্পী
৭) শাল-অরণ্যের মেয়ে
৮) নেইলি
৯) ইরাবতি
১০) আমার বন্ধু তাজুল
১১) ইকো – পার্ক আন্দোলনের নায়িকারা
১২) চিরকুট
১৩) মধুপুর
১৪) রসমঞ্জরি
১৫) আদিবাসী মন
১৬) স্বপ্ন বাড়ির উঠোনে
১৭) আমেরিকার গল্প
১৮) স্বপ্নপুরী
১৯) আমার মামা আবুল
২০) আমাদের সন্তানেরা
২১) দুই মা

পুনশ্চঃ বন্ধু – গল্পের কাহিনী ঠিক রেখে লেখায় সামান্য পরিবর্তন আনা হল। আমার বন্ধু – স্বজনদের গল্প টি শেষ করে পড়তে খুব অসুবিধা হয়েছে জেনে দুঃখিত! শূন্যমেঘ বাবুল নয়। অযথা তার জায়গায় আমাকে কেউ কল্পনা করা থেকে বিরত থাকুন। স্বজনেরা হাত – পা কাটা পড়া প্রিয় মানুষের গল্প কেউই সহ্য করতে পারেন না। ধমক খেয়ে একটু পরিবর্তন আনলুম।

নোটঃ চন্দনা মেঘকে শনু বলে ডাকে! মেঘের পুরো নাম শূণ্যমেঘ রোদ্দুর মারাক (শনু)!
[Reader’s Criticism: বাবুল দা, অাপনার লেখা টা পড়ে অসম্ভব ভালো লাগল। বাস্তব অার পরাবাস্তব কিম্বা কল্পনাকে মিলিয়ে আর এরকম detailing এর সঙ্গে বাস্তব এর এত কাছাকাছি লেখা কোনো গল্প আমি এর আগে পড়েছি কি না মনে পড়ছে না। তবে আপনার লেখাটার মধ্যে লেখক গ্যাব্রিয়েল গ্যার্সিয়া মার্কোজ এবং কবি পাবলো নেরুদা-র ছায়া দেখতে পেলাম বলে মনে হল। তবে লেখাটি খুবই ভালো এবং নতুন ধারার হয়েছে বলে আরো বেশি ভালোলাগল। তবে একটা কথা বলার আছে লিখতে গেলে একজন লেখকের সামনে যে আগে তার নিজের জীবন টা এসে ধরা দেবে এটা খুব স্বাভাবিক কিন্তু লেখক যদি নিজের গল্প লিখেও পাঠকের কাছ থেকে নিজেকে সফলভাবে লুকিয়ে রাখতে পারেন তো সেখানেই লেখা টা আরও স্বার্থক হয়ে ওঠে। তবে আপনার লেখার হাতটি যে অনেকদিনের সেটা লেখাটা পড়লেই বোঝা যায়। ঝরঝরে সাবলীল flawless লেখা।

গল্পের নাম টাও যথেষ্ট সুচিন্তিত হয়েছে তবে শিরোনাম টা যেমন একটা পূরণ না হওয়া স্বপ্নের কথা বলে তেমনই নাম টাই আবার গল্পের প্রারম্ভিক বিশ্বাসযোগ্যতা কে কিছুটা হলেও খর্ব করে যেন আগেই বলে দেয় এটি একটি কাহিনী মাত্র। তবু লেখার গুনে পাঠক শিরোনামের ওই সূত্রটুকু খেয়াল করেন না বলেই আমার বিশ্বাস।

পরিশেষে সুন্দর এই লেখাটির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং শুয়ভেচ্ছা জানাই। ভালো থাকবেন আর নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করবেন।
– Durjoy Bose, Calcutta]

Some reactions from readers:
Tuhin Nayeem lekha ta pora suru korar sathe sathe buker vhitor khub boro dhoroner ekta dhakkha khelam
but thamini pore nijake savhabik korte parlam
ki je lekho na dada
diechile to sara sharir thanda kore..
vhalo laglo khub..
nam dite paro
SHAWPNO PURON…

April 11, 2014 at 2:58pm · Unlike · 1

Sam Mrong Voyongkor doraisi dada….!! Thnxx God eita shudhumatroi golpo…!!!! Valo theko dada…..!!!

April 11, 2014 at 3:13pm · Unlike · 1

Pringku Mama moja pailam grin emoticon………. ami to 1st e real vabtasilam.. Golper namta angel emoticon !!!!!!!See Translation

April 11, 2014 at 3:20pm · Unlike · 2

Anup Nokrek মামা, পড়তে পড়তে ‘চার’ নম্বরে এসে বিরাট ধাক্কা খেয়েছি, হার্টবিট অসম্ভব ভাবে বেড়ে গিয়েছিল, শেষটা পড়ার পরও দেখি কমছে না !!!See Translation

April 11, 2014 at 3:47pm · Unlike · 2

Samrat D. Sangma Baba re…! Ami golper shes prosthan chai…See Translation

April 11, 2014 at 3:53pm · Unlike · 1

Aminul Islam Khan Mamun দুঃখিত স্যার এরকম একটা বিপদে পরব জানলে শেষের লাইনটা আগে পড়তাম। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না সত্যিই স্যার পড়ার সময় ভাবতে ছিলাম আপনাকে একবার দেখতে যাওয়ার মত কোন ব্যবস্থা করতে পারব কি এবং শরীরের লোম এরকম হবে জানলে আপনার লেখাই পরতাম না। সবার ভালবাসা পরীক্ষার লেখা সত্যিই অসাধারন।See Translation

April 11, 2014 at 4:11pm · Unlike · 2

Salma Jesmin Babul, tor ei lekha pore aamar heartbeat bere obostha karap hoye gese. BD te akhon raat dui ta, aamar hubby desher bahire, chele meye ghumachhe, ei rokom shomoy ei lekha pore……toke ekta jore shore boka dite parle valo lagto. aabar golper nam chai! phone kore j zari dei nai attai beshi.See Translation

April 11, 2014 at 4:12pm · Unlike · 1

Chiran Proshanto Sundor ebong sabolil vashai tumar golpota ek kothai chomotkkar. Bolchile goler nam khuje patcho na! Ekhono na peye thakle golper nam dite paro – khoniker dusopno. Congratulations!See Translation

April 11, 2014 at 4:47pm · Unlike · 1

Drinja Ï Chambugong অল্পের জন্য স্ট্রোক এর হাত থেকে বেচে গেলাম! আমার বদ অভ্যাসটাকেই আমার ভাগ্য বললে মনে হয় এখানে ভুল হবেনা! কোন লেখায় উত্তেজনা হলেই শেষটা আগে পড়ে নিই আমি! তবে গল্পটা সত্যিই জীবন্ত! আপনার এমন পরিনতি আমাদের কারোরিই কাম্য নয়! এমন চমত্‍কার গল্পের নাম কেমন হতে পারে তেমন চমত্‍কার সাহিত্যিক মাথা আমার এখনো হয়নি! কোন একদিন যদি হয়……!

পুনশ্চঃ পুরো গল্প টা প্রায় এক বছর পর লেখা শেষ করলাম। অনেকে হয় তো সংক্ষিপ্ত ড্রাফটা পড়ে থাকবেন। দেরী করে শেষ করার জন্য দুঃখিত!
সময় থাকলে আগের লেখা এবংঅনেকের কমেন্টসগুলোও নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে পড়ে দেখতে পারেনঃ https://www.facebook.com/bnokrek/posts/1020177695356752

Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *