শূন্য থেকে উঠে আসা এক সাহসী গারো উদ্যোক্তার গল্প

দ্য গারোজ ২৪

শূন্য থেকে উঠে আসা এক গারো উদ্যোক্তার গল্প শুনতে চাই আমরা। কিন্তু তিনি ঢাকা ওয়ানগালা’য় নতুন পণ্য
ডিজাইনের জন্য ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত। জানালেন ওয়ানগালা’র পরে সময় দিবেন। কিন্তু ওয়ানগালা’র জন্যই ইন্টারভিউ শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আবার বললেন, “ওয়ানগালা’র পরে হলে ভাল হত!” বললাম, এইটা আমাদের ওয়ানগালার জন্য বিশেষ সাক্ষাৎকার। তাতেও রাজি হন না তিনি। দ্য গারোজ ২৪ এর সম্পাদকের কথা বললে এবার সাথে সাথে রাজি হলেন!


বাবা-মা, ভাই-বোনদের সাথে গ্রাফিক ডিজাইনার এবং উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেক

কেমন আছেন?

– ভাল, খুব ভাল। তবে খুব ব্যস্ত ডিজাইন নিয়ে!

তাহলে প্রশ্ন কম করি। আপনি একটু বেশি কথা বলবেন, সময় কম লাগবে! আপনি নিজের সম্পর্কে একটু বলুন।

-বাবা মার দ্বিতীয় সন্তান কিন্তু বড় মেয়ে আমি। আমরা চার ভাই-বোন। দুই ভাই দুই বোন।

ভাই-বোনদের সম্পর্কে একটু বলবেন?

– বড় ভাই এইচ এস সি পাস করেছে! আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করলাম। বোন সরকারী পলিটেকনিক থেকে ইলেকট্রনিকস ইন্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা আর সবার ছোট ভাইটা জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলায় পড়াশুনা করছে। মোটামুটি সবাই কম বেশি পরাশুনায় এগিয়ে আছি বলা যায়। এই তো!

– বাহ! পরিবার সম্পর্কে একটু বলবেন?
– আমরা খুব খুব গরীব পরিবার থেকে উঠে এসেছি! কিন্তু পড়াশুনা কষ্ট হলেও চালিয়ে গেছি! আর এর জন্যে আমার বাবা মার প্রতি আমরা সবসময়ই কৃতজ্ঞ।

গ্রাফিক ডিজাইনার এবং উদ্যোক্তা মুনমুন নকরেক এর ডিজাইনে তাঁর বন্ধুমহল!

আমাদের পরিবারের এমনও দিন ছিল যখন আমরা দু’বেলা ঠিকমত খেতে পারিনি। মা অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন আর বাবা ভ্যান চালাতেন। তবুও সংসার চলত না! কিন্তু কোনোদিনও তাঁদের মাথায় চিন্তা আসেনি ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা বাদ দিবেন, বন্ধ করবেন অর্থের অভাবে।

– আরেকটু বিস্তারিত বলবেন?
আমরা চার ভাইবোন হাই স্কুলে থাকা কালীন প্রত্যেক ছুটিতে দিনমজুরের কাজ করে হাত খরচ জোগাতাম। এমন কি আমি অনার্স থার্ড ইয়ার পর্যন্ত মাঠে কাজ করেছিলাম হাত খরচের জন্যে। সবাই জিজ্ঞাসা করতো আমি কেন বাড়িতে গেলে কালো হয়ে আসি??? আমি আমার কালো হওয়ার রহস্য তাদের বলতে পারতাম না।

আমি যখন এসএসসি পাশ করি তখন আত্মীয় স্বজন পার্লারে যাওয়ার জন্যে বাবা মাকে খুব তাগিদ করতো। কারণ গ্রামের কিংবা পাশের গ্রামের অনেকেই পার্লারে কাজ করে ভাল চলত। আবার যখন এইচএসসি পাশ করলাম তখন নার্সিংয়ে যাওয়ার জন্যে সবাই চাপ দিচ্ছিল। অব্যাহত চাপ আর কি! কোনো ভাবেই কেউ সাপোর্ট করছিলো না আমি বা আমরা কেউ পড়াশুনা কন্টিনিউ করি। হয় তো তাদের ভাবনা ছিল খেতে পারে না তার আবার কিসের পড়াশুনা (?) – এমন! খুব দুশ্চিন্তায় এবং সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাই। অনেক নির্ঘুম রাত কাটে! পার্লারে কাজে যাওয়ার জন্যও আত্মীয় – স্বজনদের দিক থেকে অব্যাহত চাপ। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব শোচনীয়, বলে বুঝান মুশকিল! সব মিলিয়ে কাজে নেমে যাওয়ার জন্যই মনস্থ করলাম। গাজীপুর এক মামার বাসায় চলে গেলাম য কোন কাজ করার …

তারপর?

– তারপর? ম্যাজিকের মত জীবনের মোড় ঘুরে গেল! অনেক টা ‘রাখে আল্লাহ,মারে কে?’ ঠিক ঈশ্বর যেন মানুষ হয়ে নেমে এসে আমাকে নতুন একটা জীবন দিলেন আমার অচেনা, অজানা, আবছা পরিচিত আমার দূর সম্পর্কের মামা যার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বললেন। তিনি জীবনে আমাকে দেখেন নি! কিন্তু শুনেছেন, মেধাবী এক ছাত্রী এইচ এস সি পাস করে কাজ খুঁজছে!

আমি দেখা করলাম তাঁর তেজকুনী পাড়া, ফার্মগেট, ঢাকার বাসায়। সে অনেক কথা। আরেক দিন বিস্তারিত বলব। বিস্তারিত গল্প পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
তারপর?

– আমি আসলে তাঁর সাথে দেখা করে একটা জব চাওয়ার উদ্দ্যেশ্য নিয়ে দেখা করেছিলাম! কিন্তু আমার ভার্সিটিতে পড়াশুনার জন্যে যাবতীয় সব ব্যবস্থা ও সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিলেন তিনি। এ যেন না চাইতেই বৃষ্টি! ঢাকায় আত্মীয় বলতে কেউ ছিল না আমার। তখন তিনিই সব ধরণের দায়িত্ব বহন করেছিলেন। যার বদৌলতে আজ আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। এতদূর আসতে পেরেছি। তিনি আমার মামা বাবুল ডি’ নকরেক।

আসলে কেউ একজন (সম্ভবত অনুপম চিসিম দা) মামাকে নাকি বলেছিলেন যে আমি খুব মেধাবী কিন্তু টাকার জন্য আর পড়াশুনা হচ্ছে না! পরে তিনি ফোন করে আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন। আসলে, পরে ফোনেই প্রথম পরিচয়। এর আগে শুধু জানতাম আমাদের এক দূর সম্পর্কের মামা ঢাকায় অধ্যাপনা করেন আর সাংবাদিকতা করেন! তারপর দেখা, কথা, পরিচয় আর সেই থেকে আজ পর্যন্ত ছায়া হয়ে আছেন তিনি আমার অভিভাবক হয়ে। তাঁর পরামর্শ নেই সব সময়। অনেক সাহস পাই।

– জানতাম না তো!

মজার ব্যাপার হল আমি তাঁকে মামা ডাকি না!

– কি ডাকেন তাহলে?

– ঐটা তাকেই জিজ্ঞেস করবেন। হাহাহা …

বলে ফেলেন…

– প্রথম যেদিন ভয়ে ভয়ে তাঁর ওখানে গেলাম, একটু লজ্জা, ভয় আর সংকোচ ছিল। কারণ আমি তাঁকে চিনলেও তিনি কিন্তু আমাকে চিনতেন না। দেখা হবার পরেও আমাকে বার বার বলতে হচ্ছিল, মামা আমি মুনমুন নকরেক। আপনি আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন!

তারপর তিনি সহজ করার জন্য বললেন, আমি হলাম তোমার মামা! দুই মা সমান এক মা+মা! সত্যি দুই মা সমান এক মামা। তাঁর কথার মাহাত্ম এখন বুঝতে পারি আমি। অনার্স শেষ করার পর সবাই যখন আমাদের পরিবার, বাবা, মাকে সম্মান করতে শুরু করল, সমাজে আমাদের গুরুত্ব বাড়ল। সবাই সমীহ করেন, ভালোবাসেন। তখন বুঝলাম মা+মা আমার জীবনের জন্য কী করেছেন। সেই থেকে আমি তাঁকে মম (মামা থেকে এক মা ফেলে দিয়েছি!) ডাকি! (মুনমুন চোখ মুছে!)

তারপর?

– ভার্সিটি লাইফ শেষ হওয়ার পর সবারই একটা স্বপ্ন থাকে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। আমারও ছিলো। মামা আমাকে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন! অনেক বড় বড় মানুষের গল্প বলেছিলেন যারা খুব গরীব থেকে বড় মানুষ হয়েছিলেন। আমি যখন আমার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অসম্ভব, অলীক স্বপ্ন বলছিলাম তখন তিনি পাওলো কোয়েলহো’র একটি লাইন শুনিয়েছিলেন মনে আছে, “তুমি যখন সত্যি কিছু মন থেকে চাও, সমস্ত পৃথিবী তোমাকে সহায়তা দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।” এটার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছিলেন। তারপর আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জন্য রাজি হই! আমিও স্বপ্ন দেখতে শুরু করি! আমার বাবারও স্বপ্ন অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর। তাঁরও খুব ইচ্ছে ছিলো আমি বিসিএস ক্যাডার হই। এছাড়াও গতানুগতিক প্রায় সবারই একই চাওয়া। আমিও তাই পড়তে শুরু করেছিলাম। কিন্তু পড়তে পড়তে এক সময় মনে হল বিসিএস ক্যাডার হতে আরও কয়েকটা বছর লেগে যাবে। এত সময় আমার হাতে নেই। পরিবারের অবস্থা খুব একটা ভাল না। নিজেকে কিছু একটা করতে হবে পরিবারকে সাহায্য করার জন্য।

মুনমুনের নিজ হাতে ডিজাইন করা আপসান পণ্য! পানচিনি প্যাকেজ!

ডিজাইন কোথায় শিখলেন?
– হ্যা বলছি! ঠিক সেই সময় নকরেক আইটি এর কথা অনেকের মুখে মুখে শুনতে পেলাম ও আমি নিজেও ফেইসবুকের মাধ্যমে জানতে পারলাম। তারপর খুব আগ্রহ নিয়ে নকরেক আইটি এর সিইও সুবীর জেভিয়ার নকরেক এর কাছে গেলাম আর তার কথামত ভর্তিও হয়ে গেলাম গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে কোর্স করার জন্যে। কোর্স চলাকালীন দাদার মুখে অনেক কথাই শুনতাম। অনেক ভাল লাগতো আমার এমন ভাল ভাল কথা গুলো শুনতে। বাবুল মম আমেরিকা চলে গেলেন। তাঁকে খুব মিস করতাম – যদিও যোগাযোগ ছিল। তিনি উৎসাহ দিতেন সব সময়। তাঁর সাথে কথা বললে মনে হত আমি সব পারব। সুবীর দাদার কাছে ডিজাইন শিখতে গিয়ে আমি আরেকজনকে পেলাম যে তাঁর পরের ধাপে আমার হাত ধরে পথ দেখালেন।


মুনমুনের নিজ হাতে করা ডিজাইন
– যেমন?
সব সময়ই একটা বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার হতো আর সেটা হল নিজে কিছু করা আর অন্যের জন্যে কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি করা। আর দাদার সেই কথাগুলো আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করতো। এভাবে আমি অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম টিশার্ট এর ব্যবসা করবো। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন জনের সাথে কথাও বললাম। ডিজাইন করাও শুরু করে দিলাম। কিন্তু এমন করতে করতে আমি একসময় ভাবলাম যে নিজেদের নিয়ে কাজ করলে কেমন হয়! যেই ভাবা সেই কাজ। আমি আমাদের মানদিদের তাঁত সংকটের কথা ভেবে তাঁতের গামছা দিয়ে আমার ব্যবসা শুরু করলাম। দেখলাম অনেকেই খুব আগ্রহের সাথে পজিটিভ রেসপন্স করছে। আর তখন থেকে আমি ভাবতে শুরু করলাম মাইকেল মধূসুদনের কথাও। আমি যদি সফল হতে চাই তাহলে নিজের জন্যে ও জাতিকে নিয়েই কাজ করতে হবে। আর এ থেকেই আমি একে একে আমাদেরর ঐতিহ্যবাহী জিনিস গুলো আইডিয়া করে করে বিভিন্ন ভাবে তোলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আর দেখতে পাচ্ছি সবাই খুব সাড়া দিচ্ছেন।


নিজেদের জিনিসগুলো, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ফিরে পেয়ে অনেকেই অনেক খুশি। আমি অর্থনীতির স্টুডেন্ট হিসেবে সবসময় নিজস্ব ও দেশীয় অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করবো এটাই স্বাভাবিক। আর তাই আমি আমাদের হস্তশিল্প গুলোকে বাজারের মাধ্যমে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এতে করে আমাদের লোকদের কর্মসংস্থান যেমন সৃষ্টি হবে ঠিক তেমনি নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে। আর অর্থনীতিতে আমাদের অবদানও বেড়ে যাবে। আর এসব পণ্য যদি আমি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারি তাহলে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা হবে। এভাবে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবো। আর আমি এভাবেই আমার নিজ জাতি ও দেশের জন্যে কাজ করে যেতে পারবো। এতে করে আমার একদিকে যেমন জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে অন্য দিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারকে সাহায্য করতে পারবো ও দেশ-বিদেশে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবো।

মুনমুনের নিজ হাতে করা ডিজাইন

আমি কোটায় ভর্তি হয়েছি তাই সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার সৌভাগ্য হিসেবে আমি জাতির জন্য এতটুকু কাজ করতে চাই।আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে সরকার ও জনগণ যে সুযোগ-সুবিধা আমাকে দিয়েছেন তার জন্যে আমার কাজের মধ্য দিয়ে তাদের জন্যে কাজ করতে চাই। আর “আপসান” তারই বহিঃপ্রকাশ। আপসান এর মধ্য দিয়ে একতা বা শক্তি বোঝাতেই আমি স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমি শুধু নিজ জাতি নয় অন্যান্য সকল জাতির সাথে এক হয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখি।

এই তো! আপনাকে ধন্যবাদ।

– আরও দুই একটা প্রশ্ন ছিল।
– বলুন।

– আপনার ছাত্র জীবন সম্পর্কে আরেকটু বলবেন?

– ছাত্রী হিসেবে আমি বরাবরই খুব আদরের ছিলাম শিক্ষকদের কাছে। আর আমার সব সময়ই বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনার সুযোগ হয়েছিল। ছাত্র জীবনে অনেক ভাল ভাল শিক্ষক ও বন্ধু ছিল আমার।

– ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?

ছোট বেলায় সন্ন্যাসব্রত নিতে চাইতাম তাদেরকে খুব ভাল লাগতো। মনে হতো যেন স্বর্গ থেকে এসেছেন

– উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন কবে থেকে দেখলেন?

– নকরেক আইটি তে গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্স নেওয়ার পর থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার বীজ বুনা হয়। সুবীর জেভিয়ার নকরেক দা সে কাজটি করেছেন আমার মনের অজান্তেই।

– কেন উদ্যোক্তা হলেন?

নিজের জন্যে ও অন্যের জন্য তথা জাতির জন্যে কিছু করার ইচ্ছা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভাবলাম

– উদ্যোক্তা মুনমুন এর একটি সারাদিন সম্পর্কে একটু বলুন
আমার সারাটা দিনই কাটে ডিজাইন নিয়ে আইডিয়া করতে করতে আর অনলাইনে আমার প্রিয় মানুষদের নিয়ে যাদের জন্য আপসান আজ এই পর্যন্ত।

– কোন জীবন টা বেশি ভাল লাগে – ছাত্র জীবন? না কি উদ্যোক্তা জীবন?

– ছাত্র জীবনটার মধ্যে ভার্সিটি জীবনটা স্বর্গীয়, অতুলনীয়। অনেক মজা। তবে কর্মময় জীবনটাই ভাল লাগছে। কারণ এখন আমি নিজের ও পরিবারের এবং সমাজের জন্যে কিছু করতে পারছি। দেওয়ার মধ্যে আনন্দ বেশি!

– আপনার সব থেকে খুশির দিন টা শেয়ার করবেন?

আমার সব থেকে খুশির দিনটি হলো যখন আমি জানলাম আমার এসএসসি পাশ হওয়া উপলক্ষে বাবা ‘চু’ ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাবা আমার জন্য তার এত বড় একটা নেশা ত্যাগ করার শপথ নিয়েছিলেন যা আজও ভাবতেই আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পরি খুশিতে।

– কোন দুঃখের দিন?

আমার দিদি কোয়েলের মৃত্যুর দিনটাই আমার জীবনের সবথেকে দুঃখের দিন। কারণ এই দিন আমি দিদির লাশ নিজেও বহন করেছিলাম। সেদিনই উপলব্ধি করেছি কত ভারী এক প্রিয়জনের লাশ!

– কোন শখ? অবসরে যা করতে পছন্দ করেন …

ঘর গোছানো আমার সব থেকে বড় শখ। অবসরে আমি ঘর গোছাতেই বেশি সময় ব্যয় করি। ভালোলাগে

– না পাওয়ার কোন দুঃখ আছে?

না পাওয়ার দুঃখ তো আছেই। তবে বলা যাবে না

– জীবনে পান নি, কিন্তু এখনও পেতে চান, এমন কিছু?

জীবনে পাইনি এমন কিছু আছে যা এখন আর পেতে চাই না। আফসোস নাই। কারণ না চাইতেই পেয়ে গেছি অনেক কিছু। আর তা হলো মানুষের ভালোবাসা আর এই ভালোবাসাটাই সবসময় পেতে চাই বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও।

– উদ্যোক্তা না হলে কী হতেন?

উদ্যোক্তা না হলে বিসিএস ক্যাডার হতাম মনে হয়! হয় ত ম্যাজিস্ট্রেট!

– ভবিষ্যৎ কোন প্ল্যান?
– আমার ভবিষ্যত প্লান আমাদের হারাতে বসা তাঁত শিল্প নিয়ে। আমি আমাদের তাঁত শিল্পকে নিয়ে কাজ করতে চাই ও ভবিষ্যতে ডক্টরেট ডিগ্রী নিতে চাই তাঁত শিল্পের উপর। আর আমি চাই আমরা স্বনির্ভরশীল হই ইন্ডিয়ার উপর কাপড়ের জন্যে যেন আমাদের নির্ভর করতে না হয়।

– প্রিয় বই?

ডেল কার্নেগীর বই গুলো খুব পড়ি।

– প্রিয় কথা বা লাইন বা উক্তি?

“পড়াশুনার উদ্দেশ্য যদি চাকরি হয় তাহলে তুমি চাকরই পাবে, মালিক পাবে না”..এ পি জে আবুল কালাম আজাদ বলেছেন।

– কার লেখা বেশি পড়েন?

হুমায়ুন আহমেদ। বাবুল ডি’ নকরেক এর ছোট গল্প ভাললাগে, বার বার পড়ি!

– প্রিয় গান?

রেরে, সেরেজিং(মান্দি লোক গান খুব ভাল লাগে)

– প্রিয় ব্যক্তিত্ব?

আমার ছোট ভাই। ডিফরেন্ট একটা মানুষ! এছাড়া বাবুল মামা, সুবীর দাদার কথা বলা বাহুল্য।

– আপনার মূল্ধন কত?
– ১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। মা – বাবা দিয়েছিলেন আমার আইডিয়া’র কথা শুনে! অনেক অনেক কষ্টের মূলধন!

– এখন মূল্ধন কত হবে?
– হাহাহা … বলা যাবে না!
– ভাই বোনদের পড়াশুনার খরচ?
– এখন আমিই দেই …

– জীবনে কারো কাছে ঋণ?
– অবশ্যই বাবা-মা! আর বাবুল ডি’ নকরেক, সুবীর নকরেক। আর শিক্ষকদের কাছেও ত অনেক ঋণ। আর মানুষের ভালোবাসার ঋণ তো আছেই, তাই না?

জীবনে অপূর্ণতা?

– মনে করি নেই। আমি সবকিছু পজিটিভলি দেখি।

– নতুন প্রজম্মের জন্য কিছু ব্লুন

নতুন প্রজন্মকে আমি এটাই বলতে চাই নিজের ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিন। নিজের যা করতে মন চাই তাই করার সাহস করুন। কে কি বললো সেটা না ভেবে নিজে কি করছেন সেটা নিয়ে সময় কাটান।মনে রাখবেন জলে না নামিলে কেহ শেখে না সাঁতার। চাকরীর পিছনে না ছুটে নিজের জন্যে তো বটেই আরও অন্যান্য বেকারদের জন্যে কিছু করার চেষ্টা করি। সেই সাথে যারা নিজ উদ্যোগে কাজ করছে তাদেরকে উৎসাহিত করতে না পারি নিরুৎসাহিত করা থেকে যেন বিরত থাকি। সৎ সাহস ও কাজ করার ইচ্ছা শক্তি থাকলে ছোট কাজগুলো একদিন অনেক কিছু এনে দিবে আমাদের।

আর কিছু বলবেন?

আমার জীবনের প্রথম ধাপে স্কুল – কলেজ পর্যন্ত বাবা-মা পথ দেখিয়েছেন। তারপর দ্বিতীয় ধাপে বাবুল ডি’ নকরেক আমার হাত ধরে উচ্চ শিক্ষার সিঁড়িতে তুলে দিয়েছেন। তাঁর দেখানো পথে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হাটলাম। দেখলাম, অনেক বন্ধুর দেখা পেলাম, শিখলাম অনেক কিছু। জীবনকে নতুন করে আবিস্কার করলাম। তারপর তৃতীয় ধাপে নকরেক আইটির দেখানো পথে কর্মজীবন। আমার মনে হয় এই মানুষদের ঈশ্বরই প্ল্যান করে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন না চাইতেই – আমার বিশ্বাস! বাবুল মামাকে যেদিন প্রথম বললাম, আপনি আসলে আমার দুই মায়ের সমান। তিনি বললেন, “দুই মা সমান এক মা+মা, কিন্তু মামা কখনও মায়ের সমান নয়!” আসলে মা বাবা ত মা বাবা-ই। তাঁদের সব ধাপেই পেয়েছি, পাচ্ছি।

– আপনাকে ধন্যবাদ।
– দ্য গারোজ ২৪ কেও। পাঠকদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। শুভ ওয়ানগালা।

অনুলিখনঃ জেফিরাজ দোলন কুবি, নিউজ এডিটর, দ্য গারোজ ২৪

Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

1 thought on “শূন্য থেকে উঠে আসা এক সাহসী গারো উদ্যোক্তার গল্প”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *