গায়ে হলুদ কি আমাদের সংস্কৃতি?

 

 

বাঙালি সমাজে বিয়ের সময় গায়ে হলুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। তাদের বিশ্বাসমতে, গায়ে হলুদ একটি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, যা প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। হিন্দু সমাজে এই পর্ব গাত্রহরিদ্রা বা অধিবাস নামে অভিহিত। মুসলমানেরা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে এটি পালন করে থাকে, যেমন- গায়ে হলুদ, হলদি কোটা, তেলই, কুড় দেওয়া ইত্যাদি। বিয়ের তিনদিন, পাঁচদিন বা সাতদিন আগে বর ও কনের গায়ে হলুদ মাখানোই এই অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আধিভৌতিক ও অপশক্তির প্রভাব দূর করতে হলুদ অত্যন্ত কার্যকর বলে বিশ্বাস প্রচলিত। এসব কারণেই গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের প্রচলন। এছাড়া, আরেকটি বিশ্বাসও প্রচলিত আছে। হলুদ চামড়ার রোগ, যেমন- দাদ, চুলকানি, এমনকি গায়ের দুর্গন্ধও দূর করে। বিয়ের মাধ্যমে এক বাড়ির রোগ যাতে আরেক বাড়িতে সংক্রমিত হতে না পারে, সেজন্যই বিয়ের সাতদিন আগে হলুদ মাখার নিয়ম চালু হয়। পরবর্তীতে তা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

সে যাই হোক, বিভিন্ন সূত্র মতে, এই সংস্কৃতি বাঙালি সমাজেই প্রচলিত। গারো প্রথা বা সংস্কৃতির কোন দলিলে বিয়ের সময় গায়ে হলুদের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এই আচার গারো সমাজের সংস্কৃতির অংশও নয়, এটি গারো সমাজের কোথাও প্রচলন ছিল না। কিন্তু ইদানিং গারো সমাজের কিছু বিয়েতে গায়ে হলুদের পর্ব আয়োজন করতে দেখা যাচ্ছে। অসচেতনভাবেই হোক বা অবচেতন মনেই হোক, আমাদের অনেকেই অন্য সমাজের আচার আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছি। এতে গারো জাতির ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা হারিয়ে যাচ্ছে। অন্য সমাজের সাথে আমাদের সমাজের পার্থক্য থাকছে না। আমাদের এই ধরনের অসচেতনতার কারণে আমাদের অনেক সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে এবং অনেক সংস্কৃতি হারানোর পথে। ভিন্ন সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের পর এর প্রচলন ব্যাপক আকারে হলে, এর বিরুদ্ধে কথাও বলা যাবে না বা বললেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই প্রাথমিক অবস্থাতেই ভিন্ন সংস্কৃতির প্রবেশ রুখে দিতে হবে। নতুবা কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে হবে ঠাস ঠাস।

 

 

 

কয়েকটি কারণে একটি সমাজের কোন সংস্কৃতি পরিবর্তিত হতে পারে। কোন সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় আইনের বিরোধী হলে, বা পালন করা কঠিন হয়ে পড়লে বা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হলে কিংবা সাধারণ নীতিবিরুদ্ধ হলে। প্রয়োজনের তাগিদে সমাজের লোকজন উপরোক্ত কারণে কোন সংস্কৃতি পরিবর্তন করে ফেলে। উপরের কারণগুলোর একটিও নয়, যার কারণে গারো সমাজে গায়ে হলুদের প্রচলন হচ্ছে। আর অন্য সমাজ থেকে নকল করা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

 

 

এখন প্রশ্ন হল- গায়ে হলুদ করলে কীই বা রামায়ণের অশুদ্ধ হবে বা বাইবেলের অমান্য হবে। না, রামায়ণও অশুদ্ধ হবে না বা বাইবেলের অমান্য হবে না। যেমন করে আমার নামের শেষে হোসেন, মিয়া বা আলী কিংবা ঘোষ, দাস বা কর্মকার লিখলেও রামায়ণের অশুদ্ধ হয় না বা বাইবেলের অমান্য হয় না। এখন আমাদেরই সিদ্ধান্তের বিষয়- আমরা কি নামের শেষে হোসেন, মিয়া লিখব নাকি ম্রং, মৃ বা চিসিম লিখে আমাদের স্বকীয়তা ধরে রাখব।

 

  সিনিয়র সহকারী জজ 

তথ্যসূত্র:

bn.wikipedia.org

bn.banglapedia.org

ebanglapedia.org

alokrekha.com

এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট।

 

Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

2 thoughts on “গায়ে হলুদ কি আমাদের সংস্কৃতি?”

  1. আমরা মানুষ মাত্রই পরিবর্তনশীল এবং অনুকরণে অভ্যস্ত।। যেহেতু আমরা বাংলাদেশের নাগরিক সেহেতু বাঙ্গালি সংস্কৃতি আচার আচরণ আমাদের মাঝে আসা তাই স্বাভাবিক। তাছাড়া শুধু গায়ে হলুদই নয় বিয়ের পোশাকাদিও আমাদের নিজস্ব নয়।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *