এভাবে চলে যেতে নেই

বাবুল ডি’ নকরেক

ফেইসবুকে চোখ পড়ল কিছু স্ট্যাটাস! বন্ধু নিবিড়ের অবস্থা খুব খারাপ! সবাই দোয়া কর – এমন জাতীয় কিছু। বুঝার চেস্টা করছি কোন নিবিড়, কোথায় তার বাড়ি, সে কী করে। কারা তার বন্ধু মহল ইত্যাদি।

অবশেষে, টিউশন রিছিল এবং জয় জাখারিয়াস ম্রং এর স্ট্যাটাস থেকে কিছুটা জানলাম। নিবিড় মৃঃ তাদের বন্ধু। নিবিড়ের ফেইসবুক প্রোফাইল থেকেই জানলাম, সে একজন ফুল স্টাক ওয়েব ডেভেলপার! মান্দিদের মধ্যে কতজন ফুল স্টাক ওয়েব ডেভেলপার আছে আমার জানা নেই। তবে হাতে গোনা যাবে এটা ধারণা করতে পারি। তরুণ ফুল স্টাক ওয়েব ডেভেলপারকে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই বাচিয়ে রাখা জরুরী ভেবেই আমি নিজ উদ্যোগে তার খোঁজ নিতে শুরু করি। আমার স্ত্রী জানাল, নিবিড় তার ছাত্র ছিল স্কুল জীবনে!

তার বন্ধু টিউশনকে ফেইসবুকে নক করে নিবিড় সম্পর্কে জানলাম। জানতে পারলাম আচিক ব্লুজ ব্যান্ড এর বিমল নকরেক এর সাথে তার ভাল সখ্যতা ছিল। বিমলকে নক করলাম। সে জানাল তারাও তার চিকিৎসার জন্য ফান্ড তুলবে। নকরেক আইটি’র সি ই ও সুবীর জেভিয়ার নকরেকেও নক করলাম। জানতে চাইলাম সে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ছাত্র কি না। সুবীরই জানালেন, নিবিড় কোডারস ট্রাস্ট এর ছাত্র। এ ছাড়া ইন্সটিটিউট অব কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ট্যাকনোলজির ছাত্র সে। আমি সুবীরকে বললাম, নিবিড়কে বাঁচাতে হবে। তার জন্য দ্রুত ফান্ড যেন ক্রিয়েট করা হয়। সুবীর একমত।


ফাইবার মার্কেট প্ল্যাসে ফুল স্টাক ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে নিবিড়ের সার্ভিসগুলো!

সুবীরকে গুরুত্ব দিয়ে বলার কারণ হল, নকরেক আইটির ছাত্র-শিক্ষক যারা ফ্রীল্যান্সিং করেন তাঁরা ১০-২০ ডলার করে দিলেও অন্তত লাখ খানেক টাকা ১-২ দিনেই চলে আসবে। আর কারোর পক্ষে এত দ্রুত অনুদান তোলা সম্ভব নয় যা ফ্রীল্যান্সার কমিউনিটি করতে পারবে। আর নিবিড়ও যেহেতু ফ্রীল্যান্সিং শুরু করেছিলেন, সেদিক থেকে সে এই কমিউনিটির সাথে পরিচিত।

এ যাবত ৪৯টি দেশের ছাত্র-ছাত্রীকে আমি ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েব ডিজাইন এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট পড়িয়েছি! শত শত ফ্রীল্যান্সারকে সফট স্কিলস, ইংরেজি শিখিয়েছি। তাঁদের বেশীরভাগ ফ্রীল্যান্সার! তাঁদের প্রত্যেককে বলেছি, “আমাদের এই তরুণ ফ্রীল্যান্সারের পাশে দাঁড়াতে হবে!” সবাই তো এক বাক্যে রাজি ছিল!

আমি নিবিড়কেও একটা এস এম এস পাঠালাম, সে যেন দুশ্চিন্তা না করে। আমরা সবাই তার পাশে আছি। বাংলাদেশে তখন গভীর রাত। নিবিড়ের বাবাকেও নক করি। তিনি হয় ত ফেইসবুকে অতটা একটিভ নন।

নিবিড়কে লেখা আমার প্রথম এবং শেষ এস এম এস!

আমি আমার খুব কাছের বন্ধুদের নক করলাম। সবাই তার চিকিৎসার জন্য অনুদান দিতে প্রস্তুত।

এর মধ্যে তার বন্ধু জয় ম্রং এর স্ট্যাটাস থেকে জানলাম, তার সব বন্ধুরা ইতোমধ্যেই ফান্ড তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। আমি আমাদের নিউজ এডিটরকে জয়ের স্ট্যাটাস টি স্ট্যাটাস ‘অব দ্য ডে’ বিভাগে ছেপে দিতে বললাম। ছাপা হল। আমি বন্ধুদের সাথে কথা বলছি তার চিকিৎসার ফান্ড নিয়ে। সবাইকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। নিবিড়কে ফোন দেওয়ার কথা ভাবছি। তার মায়ের ফোন নম্বরটাও জোগার করলাম। এর মধ্যে ঢাকা থেকে নিউজ চলে এল, “না ফেরার দেশে চলে গেলেন সম্ভাবনাময় সফটওয়্যার ডেভেলপার ও তরুণ সঙ্গীত শিল্পী নিবিড় মৃঃ!”

চুপ করে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যে আমার স্ত্রী বলল, “নিবিড় চলে গেছে! ফেইসবুকে তার বন্ধুরা স্ট্যাটাস দিচ্ছে, নিবিড় আর নেই!” জয়ও জানাল, “মামা, নিবিড় আর নেই!”

আমরা এই ত ঘন্টা খানেক আগেও কথা বলছিলাম, নিবিড়কে ঐ হাসপাতাল থেকে সড়াতে হবে! আমাদের ধারণা ছিল হাসপাতালের ডাক্তারগণ ইচ্ছে করে নিবিড়ের অবস্থা খারাপ করে তুলছে। সম্ভবত নিবিড়ের অবস্থা এতটা খারাপ নয়! ঘন্টায় ঘন্টায় নিবিড়ের বিভিন্ন রোগের ফিরিস্তি বেড়ে চলছিল! টাইফয়েড থেকে থ্যালাসামিয়া আবার কিডনি সমস্যা, কেমন যেন সুখকর মনে হচ্ছিল না।

আমি নিবিড়কে কখনও দেখি নি। আমি তাকে চিনি না, জানি না। হয় ত কোনদিন দেখাও হয় নি! কিন্তু ফেইস বুকে তাকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেখেই অস্থির হয়ে উঠলাম! মনে হল নিবিড় আমার পরিবারের ছেলে, আমাদের স্বজন। কেমন একটা টান অনুভব করলাম। কিন্তু ২৪ ঘন্টাও সময় পেলাম না। এর মধ্যেই নিবিড় চলে গেল।

২৪ বছরের একজন যুবক যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়, আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের সবাইকেই চলে যেতে হবে একদিন! এ সময় টা শুধু নিবিড়ের চলে যাবার পালা ছিল।

ছোট ভাই বিলশন মৃঃ এর স্ট্যাটাস পড়ে জানলাম, নিবিড় মৃঃ আমাদের আত্মীয়! বিলশন মৃঃ আমার আপন মামার ছেলে। আর নিবিড় বিলশনের আদরের ভাগনে!

নিবিড়, এভাবে যেতে নেই। তুমি তোমার বন্ধুদের কাজ করার সুযোগই দিলে না। আমি না হয় তোমার কেউ না!

নিবিড়ের মত যেন আর কেউ চলে না যায়।

Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *