আমার বন্ধু প্রদীপ

এক

১৯৯৪-৯৫ সাল।

আমার বন্ধু প্রদীপ কুমার সরকার। নটর ডেম কলেজে এক সাথে পড়তাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমি ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলাম আর সে ভর্তি হল সাংবাদিকতায়। তুখোর ছাত্র ছিল প্রদীপ।
সাংবাদিকতায় ভর্তি হয়েই আজকের কাগজে সহ-সম্পাদক হিসেবে জয়েন করল। ক্যাম্পাসে আজকের কাগজ তখন বেশ চলে। ভোরের কাগজও। প্রদীপ আজকের কাগজের সহ-সম্পাদক। তখন ইত্তেফাক পড়ে বেকার দাদা দিদিরা। এছাড়া ছাড়া অন্যান্য পত্রিকা ক্যাম্পাসে খুব একটা চলে না!
একদিন বন্ধুকে বললাম, “তনু (ছদ্ম নাম) মনে হয় তোমাকে পছন্দ করে। চুপি চুপি তোর দিকে বার বার তাকায়!”
ও বলল, ধুর! তুই খেয়াল করেছিস, তার দাঁড়ি – মুছ আছে! হাত ভর্তি লোম!
আমি বললাম, “এই দাঁড়ি মুছ, লোম থাকার সাথে ভালোবাসার কী সম্পর্ক? মেয়ে তো ভাল। জিনিয়াস!”
না-রে দোস্ত, হবে না! আমার বুকে প্রেম জাগে না! তুই দেখ!

দুই

দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস যায়।
একদিন প্রদীপ বলল, দোস্ত, তনু মেয়ে টা অ-ন্নে-ক সুন্দর। তোর কথা ঠিক। আগে ভাল মত তাকাই নাই। ভয়াভহ সুন্দর! আমি অকে ছাড়া বাচুম না দোস্ত! বন্ধু। তুই তনুকে বল, আমি রাজি!
আমি বললাম, “ধুর মিয়া, দাঁড়ি – মুছ, হাত ভর্তি লোম …
সে বলল, “কই দাঁড়ি, কই মুছ? কই হাত ভর্তি লোম দেখস? আমি তো অসব দেখি না আর!”
আমি বললাম, ‘মনে কর আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে! কৃষ্ণচূড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে …’

তিন

এরপর ওরা আর আমাকে নিয়ে বসে না, আড্ডা দেয় না! আলাদা কোথায় কোথায় বসে! আমিও আর ওদের ডিস্টার্ব করি না …

চার
তনু গ্রীস্মের ছুটিতে বাড়ি গেল …
ফিরে এলো সিঁথিতে সিঁদুর রাঙিয়ে …
প্রদীপের কান্না কে আর দেখে? হাতে হাতে সিগারেটের পোড়া দাগ বেড়েই চলে। বুকেও কয়েকটা সিগারেটে নিজের ঠেসে ধরা পোড়া ঘা। ওসব কে দেখবে? ওর দিকে তাকান যায় না আর। আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি আর গুনগুনিয়ে চলি, “সখি ভাবনা কাহারে বলে …
আমি অকে বললাম, দেখ দোস্ত, তুই বিশ্ববিদ্যালয় পড়িস। অনেক বুঝিস। জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। দেখবি, একদিন সব ঠিক হয়ে গেছে…
ও বলে, “সে ক্যান আমার সাথে প্রতারনা করল? আমি কী দোষ করেছিলাম। ক্যান সে প্রেম নিবেদন করল? আমি তো এমনিতেই ভাল ছিলাম…
আমি তনুর পক্ষে ওকালতি করে বলি, তোর সাথে প্রতারণা করে নি। সে জানত না ওর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। ওকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এবং সেটা তোর কারণেই।
ও বলল, তুই তো প্রেম করিস নি, বুঝবি কী? ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কি সে? দংশে নি যারে।” বলে সে হু হু করে কাঁদে।
আমি তাকে বললাম, বন্ধু সেই স্কুল জীবনেই এই সব পাঠ আমার চুকে গেছে! এখন এগুলো নিয়ে আর ভাবি না। টাইম নাই। পড়াশোনা কর, লেখা লেখি কর, বই পড়, সব ভুলে যাবি একদিন…
কষ্ট হয় না? সে জিগায়।
আমি বললাম, নাহ! কষ্ট হইলে কবিতা লিখি। গান লিখি। গুনগুনিয়ে গান গাই। এই আছি বেশ…

পাঁচ

প্রদীপ আমার কবিতাগুলো দেখতে চায়। দেখে বলে, অসাধারণ! অসম্ভব কবিতা, ভয়াভহ কবিতা। তোর কবিতা গুলো বই আকারে ছাপলে সেই রকম হবে। তরুণ পাঠক লুফে নিবে।
আমি লজ্জা পাই! যদিও আমার লজ্জা টজ্জা কম! কী বলে পাগল না কি!
সে ঘেঁটে ঘুঁটে সব কবিতা বের করে। কয়েক টি পত্রিকায় মিতা চৌধুরী, বাবুল আহমেদ ছদ্মনামে ছাপা কবিতাগুলো দেখে সে জানাল ‘বিমুগ্ধ!’
আসলে বিমুগ্ধ টিমুদ্ধ হবার মত কিছু ছিল না। সে ছ্যাকা খেয়ে প্রেমের কবিতাগুলো লুফে নিয়েছিল!

ছয়

প্রদীপ নিজেও কবিতা লেখা শুরু করল। গান লিখল, সুর দিল। তখন গান লিখে, সুর দেয়, নিজেই গান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সারা ক্যাম্পাসময়! তাঁর খ্যাতি তুঙ্গে!
কিন্তু প্রায় প্রতি রাতে আমার রুমের জানালা দিয়ে ফিসফিস করে ডেকে বলত, দোস্ত, বাইরে আয়! কথা আছে। [সে কোন দিন আমার রুমে ঢুক ত না!] একই কথা তার। বই ছাপতে হবে! প্রতিদিন একই কথা, আর আমার না বলার একই কাহিনী। বই ছাপার কথা বললেই আমি হয়ে যাই লজ্জায় লাল …
আমিও এক গ্রীস্মের ছুটিতে বিয়ে করে ফিরলাম ক্যাম্পাসে! ৯০ দশকের কিছু হার্ট থ্রব নায়িকাদের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়ে একদিন আমিও জগন্নাথ হল মাঠে গলা ছেড়ে গান গাইলাম, সবাই তো ভালোবাসা চায়, কেউ পায় কেউবা হারায় তাতে প্রেমিকেরই কী আসে যায়?
প্রদীপ বলল, খুব কষ্ট পাইছি। তুই আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করতে পারলি? তুই জানিস নীরা তোকে অসম্ভব ভালোবাস ত!
আমি বললাম, কিন্তু আমি তো নীরাকেই বিয়ে করেছি, যে আমারে ছেড়ে চলে গিয়েছিল!
প্রদীপ বেপরোয়া হয়ে গেল। সে পাণ্ডুলিপি রেডি করে ফেলল।
এই সেই করে আরও এক বছর কেটে গেল। ৯৭ সাল পাড় হয়ে গেল।
পাণ্ডুলিপি নিয়ে এখন এ প্রকাশনী ও প্রকাশনী ঘুরতে থাকলাম। ২১ টা প্রকাশনী পাণ্ডুলিপি নেড়ে চেড়ে দেখে বলল, “কবিতা পাব্লিক খায় না!” “নতুন লেখকদের টাকা দিয়েই বই পাব্লিশ করতে হয়!” “কবিদের নিজের টাকা দিয়ে বই ছেপেই সামনে এগুতে হয়!” “কবি শামসুর রহমান (রাহমান কেউ বলত না!) এর কবিতার বই পড়ে থাকে, আর নতুনদের তো পরের কথা।” আরও কত কথা!
আমি কথা বলি না। প্রদীপই বলে, “সেই রকম কবিতা স্যার। খালি একবার ছাপেন স্যার। দেদারসে কাটবে। ইংরেজি সাহিত্যের বাঘা ছাত্র। খালি একবার ছাপেন প্লিজ।”
প্রদীপ সচিবদেরকেও স্যার বলে না। তার কথা হল, “ওঁরা আমাদের সেবক, সুশীল সেবক, সিভিল সারভেন্ট, আমরা তাঁদের স্যার ডাকব কেন?”
কিন্তু এই প্রদীপ তার বন্ধুর জন্য প্রকাশকদেরকেও স্যার ডাকতে শুরু করে দিল!
প্রদীপ এখন কাউকে কাউকে স্যার বলে। পারলে পা ধরবে আমার জন্য। কত অনুনয় বিনুনয় করে প্রকাশকদের বন্ধুর বই ছাপার জন্য, কিন্তু কাজ হয় না…
আমি বলি, “আমি ভাই আর প্রকাশক টকাশকের কাছে যাতি পারব না! বই না ছাপলে কী হবে? গুষ্টি কিলাই। আর লিখব না!”
একুশ জন প্রকাশকের বেশির ভাগই বলেছে, ১৫-২০ হাজার টাকা দিলে বই ছাপবে!
প্রদীপ বলল, “দোস্ত আমি ৫০% দেই, তুই ৫০% দে! তবুও আমরা বই ছাপবই। একটা সময় আসবে এই প্রকাশকরা তোর পান্ডুলিপির জন্য লাইনে দাঁড়াবে, দেখিস! বলে রাখলাম!”
‘প্রদীপের দেখিস!’ আর আমাদের জীবনে আসে নি!
আমি তাকে বললাম, নিজেদের টাকায় বই ছাপব তো অন্যের প্রকাশনীর নামে ছাপব কেন? আমরা নিজেরা একটা প্রকাশনী খুলে নিয়ে বই প্রকাশ করি!
প্রদীপ এবার হাউ মাউ করে কানল! আনন্দে সে উদ্বেল! চোখ মুছতে মুছতে বলল, দোস্ত গারো ভাষায় নাম হবে প্রকাশনীর!
আমি বললাম, গুড আইডিয়া। আমরা নাম খুঁজছি! যুতসই নাম পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরে আমি নাম দিলাম, ‘আদিবাসী প্রকাশনী’।
বইটির নাম ছিল “ভালোবাসায় শরীরের গন্ধ পাই”
প্রদীপ বলল, নাম টা অনেক লম্বা হয়ে যায়। এর চেয়ে যদি “ধর্ষিতা শালবন” কবিতার নামে হয়, চলবে ভাল। আমরা হাই ফাইভ করে নাম ঠিক করলাম।
প্রদীপ চিৎকার করে গাইল, আইও ম গিসিক রা আতা …
প্রদীপ অসম্ভব সুন্দর গারো গান গাই ত …
একবার গায়রা গ্রামের লতা’দির পানচিনি তে গারো গান গেয়ে ফাটিয়ে দিল…
অয়ান মোর অয়ান মোর আর থামে না। তার মত দরদ দিয়ে মান্দি গান গাওয়া শিল্পী গারোদের মধ্যেও মেলে না।

সাত

আজকের কাগজের প্রদীপের আরেক সহকর্মী বইটির প্রচ্ছদ করে দিলেন।
আমি আবার বেঁকে বসলাম। আর বই করব না।
গ্রামের বাড়ি গিয়ে চুপ করে বসে থাকলাম।
প্রদীপ বন্ধুদের নিয়ে সেখানে বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে হাজির!
১৯৯৭ কিংবা ৯৮ সাল একুশের বই মেলায় ‘আদিবাসী প্রকাশনী’ থেকে ‘ধর্ষিতা শালবন’ প্রকাশিত হল।
এর কয়েক বছর পর আমার অনুজপ্রতীম কমল কর্নেল চিসিম পরমা প্রকাশনী নামে আরেক টি প্রকাশনী সংস্থা খুলে বসল।
একটা বই প্রকাশ করতে কত হয়্রানির শিকার হতে হত আজ থেকে ২১ বছর আগেও!
এখন আমাদের অনেক প্রকাশনী সংস্থা আছে – চিবিমা, দাকবেয়াল, থকবিরিম।
কোথাও কোথাও দেখলাম লেখা আদিবাসীদের একমাত্র প্রকাশনী। আবার কেউ কেউ লিখলেন অমুক প্রকাশনীই প্রথম!
আমার অনেক আগে প্রশান্ত জ্যাম্বল, নিতিশ কে দ্রং, জেমস জর্ণেশ চিরান স্যার, সুভাষ সাংমা, সঞ্জীব দ্রং প্রমূখ বই প্রকাশ করেছেন।
চিবিমা, দাকবেয়াল, থকবিরিম, পরমা, তিউড়ি ভাল করছে। আমরা তাঁদের উৎসাহ দেই। ধন্যবাদ দেই। সাধুবাদ জানাই। আদিবাসী প্রকাশনী আমরা সচল রাখি নি। কিন্তু এর মানে এই নয় – আদিবাসী প্রকাশনী মরে গেছে। মনে হয় সেখান থেকে আমরা ৩ টি বই পাব্লিশ করেছিলাম। মনে পড়ে না ঠিক। কিন্তু সেটিই বোধ করি আদিবাসীদের প্রথম প্রকাশনী। আমার ভুল হতে পারে। এমনও তো হতে পারে আমাদের আগেও কেউ এমন প্রকাশনা সংস্থা করেছিল, আমরা জানি না!
কে প্রথম, কে দ্বিতীয় এসব না ভেবে সামনে এগিয়ে যাই। ভালো কাজকে উৎসাহিত করি। তবে ইতিহাস জেনে রাখলে ভাল।
আমার বন্ধু প্রদীপ ফেইসবুকে নেই। শুনেছি সে নারায়নগঞ্জের কোন এক হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে।
এই লোকটির কাছে আমার অনেক ঋণ। দেশে আসলে তার গানের এ্যালবাম আমি বাজারে নিয়েই ছাড়ব ইনশাল্লাহ!

Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *