অন্ধকার

সুবর্ণা পলি দ্রং

বাস স্টেশনে এসে থামতেই রিক্সার ঢল যেন চলে আসে বাসের দরজায়। অনিকেতের বেশ বিরক্তিই লাগে। সে বাস থেকে নামে সবার পরে। বাসের হেলপার ছেলেকে ডেকে তার লাগেজটা নামিয়ে নেয়। চারদিকে চোখ বুলায় বেশ আলস্যভরে। রিক্সার ঢল তখনো কমেনি। যাত্রীদের সাথে রিক্সাওয়ালাদের বেশ দরকষাকষি হচ্ছে ভাড়া নিয়ে। এবার অনিকেতের পালা। গ্রামে অনেকদিন হল সে আসেনি। বিভিন্ন ছুটিগুলো সে কাটিয়ে দিয়েছে শহরেই কিংবা ঘুরে এসেছে শশুরবাড়ি। তাছাড়া প্রিয়াঙ্কারও এদিকে আসার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না কখনোই। এবারের ঈদের ছুটিতেও তাই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে বাপের বাড়ি। অনিকেতেরও যাওয়ার কথা ছিল সেখানেই। কিন্তু বিশেষ কারনে এদিকে আসতে হয়েছে অনিকেতের।

– স্যার, কই যাইবেন?

– রৌদ্রনগর।

– ২০০ টাকা ভাড়া নেবো স্যার।



ভাড়ার কথা শুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল অনিকেতের। যে রাস্তা আগে পনের কি বিশ টাকা দিয়ে যাতায়াত হতো সেখানে দু’শো টাকা ভাড়া! অনিকেত বেশ মেজাজের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করল। দেশে কী তবে ডাকাত পড়ল নাকি যে বিশ টাকার ভাড়া দু’শো টাকা চাইবে? বেশ কয়েকজন রিক্সাওয়ালার সাথে বচসা করেও মনের মতো ভাড়া ফুরাতে পারল না অনিকেত। সব রিক্সাওয়ালাদের একই কথা

– স্যার, ঈদে একটু বেশি দিবেন না?
– অবশ্যই দেব কিন্তু তাই বলে এত চাইবে কেন?অনিকেতের রাগ বাড়তে থাকে। একজন রিক্সাওয়ালা দুরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল অনেকক্ষন ধরে। এবার রিক্সা নিয়ে কাছে এসে বলল, স্যার, ষাট টাকা হচ্ছে স্টেশন থেকে রৌদ্রনগরের ভাড়া। আপনার মন চাইলে ঈদ উপলক্ষে আপনি বেশি দিবেন আর তা না হলেও আমি আপনাকে জোর করব না। অনিকেত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে উঠে পড়ল লোকটির রিক্সায়।

রিক্সায় যেতে যেতে অনিকেত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। এই কয়েক বছরে কত বদলে গেছে সবকিছু। মা মারা যাওয়ার পর থেকে সে আর এ দিকে আসেনি। বাবা মারা গিয়েছিলেন অনেকদিন আগেই, যখন অনিকেত কলেজে পড়ত। জমিজমা যা আছে তা অনিকেতের বড় ভাই-ই দেখাশুনা করে আসছে এতদিন। বাবা মারা যাওয়ার আগে দুই ছেলেকে সম্পত্তি ভাগ করে রেখে গেছেন। বাবা অনেকদিন অসুস্থ্য হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন। সংসারের হালটা তাই অনিকেতের বড় ভাই শিশিরকেই ধরতে হয়েছিল। এই কাজটা করতে গিয়ে পড়াশুনাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে শিশিরকে। শিশিরের ছেলেটা শহরের কোন এক কলেজে এখন অনার্সে পড়ছে, স্ত্রী অসুস্থ। কৃষিকাজ দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বিভিন্ন কাজে অনিকেতের কাছে হাত পাতা। চাকুরী পাবার পর মাসে মাসে কিছু টাকা সে তার ভাইকে পাঠাত। বিয়ের পর প্রথমদিকে প্রিয়াংকা কিছু না বললেও পরে এ বিষয়ে তার ঘোর আপত্তি ছিল।
প্রায়ই বলত



– দেখ, তোমার ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে এদের কথাও তোমাকে ভাবতে হবে, তাই না? এত দান খয়রাত করে কি আর দিন চলবে?

অনিকেত যখন ভুমি অধিদপ্তরে বড় অফিসার পদে যোগ দিল তখন শিশিরের কি আনন্দ! দেখে মনে হয়েছিল, যেন চাকুরীটা সেই পেয়েছে। তা হবেও না কেন? নিজের পড়াশুনা সে জলাঞ্জলী দিয়েছিল তার এই ভাইটির জন্যই। সে যেন আরো এগিয়ে যেতে পারে তাই সংসারের হালটা শিশিরই ধরেছিল। অনিকেত ভাবে, এই কারনে সে শিশিরের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই বলে কি সবসময় সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা যায়? স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য মোটা অংকের টাকা ধার নিয়েছিল শিশির। এতদিন হয়ে গেছে তবু ধারটা শোধ দিতে পারেনি। তাই এবার অনিকেতের গ্রামে আসা। দাদাকে বলে কয়ে টাকার বদলে যদি তার নামের কিছু জমি নিজের করা যায়! গ্রামের বাড়িতে বড় একটা বাংলো বানানোর ইচ্ছে অনিকেতের।

সাইফুল রিক্সা নিয়ে বেরিয়েছে সকাল থেকেই। আসার সময় ছেলেটার জ্বর দেখে সে বেরিয়েছে। তাই মনটা বিশেষ ভাল ছিল না। কয়েকটা ট্রিপ দেওয়ার পর স্টেশনে এসে বসেছিল সে। যদি আরো কিছু ট্রিপ দিতে পারে এই আশায়। এই টাকা দিয়ে ছেলেটার জন্য ঔষুধ আর নতুন কাপড় কিনতে হবে। ঈদের মাত্র আর কটা দিন বাকি আছে। অথচ বউ আর ছেলে-মেয়েকে এখনও কিছু কিনে দিতে পারেনি সে। সে কথা ভাবলে বুকটা কেমন করে উঠে যেন। বাপ দাদার একচিলতে ভিটে আর তিন কাঠার মতো ধানি জমি ছাড়া আর কিছুই নেই সাইফুলের। এই জমি নিয়ে বিড়ম্বনাও কম নয়। কিছু প্রভাবশালী লোকেদের নজর পড়েছে এই জমিটার উপর। জমিটা রেজিস্ট্রি করে নিতে পারেনি এখনও।

বাস স্টেশনে পৌঁচ্ছুলেই রিক্সাওয়ালাদের ভিড় উপচে পড়ে। সাইফুলও প্রতিদিন এতে সামিল হয়। আজ কেন জানি তার ইচ্ছে হয়নি মোটেও। তাই কিছুটা দূরে রিক্সা দাঁড় করিয়ে সিটের উপর বসে ছিল সাইফুল। হঠাৎ বাসের জানালায় একজনের মুখ দেখে নড়েচড়ে বসে সে। লোকটাকে এই এলাকায় দেখে বেশ অবাকই হয় । বসে বসে দেখে, বেশ কয়েকজনের সাথে রিক্সাভাড়া নিয়ে লোকটার দরকষাকষি হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই বনছে না কারো সাথে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, লোকটা রেগে যাচ্ছে। হঠাৎ কি মনে করে লোকটার দিকে এগিয়ে যায় সাইফুল।



– স্যার, যা ভাড়া তাই দিয়েন। জোর করে বেশি চাইব না। লোকটাকে দেখে সাইফুলের মনে হলো যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।

অনিকেত রিক্সায় আসতে আসতে ভাবছিল, বাহ্, লোকটাত বেশ। সবাই কত বেশি ভাড়া চাইছিল, এমনকি দেড়শ টাকার নিচে কেউ আসতে চাইছিল না অথচ এই লোকটা ষাট টাকায় চলে আসল। এমনটি সেচ্ছায়। একটু কৌতুহল নিয়ে লোকটিকে প্রশ্ন করল, কোন গ্রামে বাড়ি তোমার? আপনি বলে ডাকতে প্রবৃত্তি হল না অনিকেতের।

– পদ্মপাড়।

– ও আচ্ছা। খুব সুন্দর গ্রাম। আগে অনেকবার গিয়েছি সেখানে।

– তা এই আর কি।

– তুমিত খুব সৎ লোক। অনিকেত হেসে বলল। হাসিটা একটু ব্যঙ্গের মতো শুনাল বোধয়।

অনিকেতের মনে হল লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, এই দুনিয়ার সৎ লোকের বড় অভাব স্যার। সৎ থাকতে চাইলেও কি সবসময় সৎ থাকা যায়? কথাট খচ করে কানে লাগল অনিকেতের। লোকটা আবার বলল, যারা সৎ তাদের অনেক কষ্ট স্যার। দুনিয়ায় খারাপ লোকের জয়, সৎ লোকের পেটে লাঠি।

অনিকেতের এইসব কথা শুনতে ভাল লাগছিল না। সামান্য রিক্সাওয়ালার অসামান্য কথায় বিরক্তবোধ করল সে। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাল।

– বাড়িতে কে কে আছে তোমার?

– বউ আর দুই ছেলে-মেয়ে।

– বাচ্চারা লেখাপড়া করছে?

– কষ্টের সংসার স্যার। তাই পড়াই কোনমতে। খাতা থাকলে কলম থাকে না, কলম থাকলে খাতা থাকে না।

– কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে। পড়ালেখা করে শিক্ষিত হলে এরাই তোমাকে একদিন দেখবে।

লোকটা হাসল। সরল হাসি। বলল, স্যার, পড়াশুনায় শিক্ষিত হলেই কি সব হয়? যদি মানুষ হতে না পারে? আসল মানুষ হওয়ার জন্য আসল পড়াশুনা দরকার। লোকটার এই জ্ঞানগর্ভ কথা ভাল লাগে না অনিকেতের। জানতে চায়, জমি-জমা কিছু আছে?

– বলার মতো কিছু নাই স্যার, বাড়ি ভিটা আর তিন কাঠার মতো ধানি জমি। তাও রেজেস্ট্রি করা নাই।

– রেজেস্ট্রি করছ না কেন?

– চেষ্টা কি আর কম করেছি স্যার! টাকা ছাড়া যে দুনিয়া বড় ফাঁকা। দুনিয়া বড় আজব জায়গা স্যার।



লোকটা কথা বলছে হেয়ালী করে। তবু অনিকেতের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে। শরীর কি খারাপ লাগছে তার? তবে এভাবে কেঁপে উঠা কেন? সন্ধ্যা হয়েছে বলে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। নিজেদের ভিটের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইল টর্চ জ্বেলে মানি ব্যাগ থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে দেয় লোকটার দিকে। লোকটা হাসিমুখে টাকাটা নিয়ে চল্লিশ টাকা ফেরত দেয় অনিকেতকে। সেখান খেকে আরো দশটাকার একটা নোট এগিয়ে দিতেই মাথা নেড়ে সে না করে। বুঝাতে চাইল, বাড়তি টাকা তাকে দেওয়া লাগবে না। মুখে বলল, স্যার, আপনাদের কাছে দিতে কতশত মানুষ যায়-আসে সবাইকে কি আর আপনাদের মনে থাকে? মনে রাখার কথাও না। স্যার, আমি কিন্তু আপনাকে প্রথম দেখেই চিনে ফেলেছিলাম। জমি রেজেস্ট্রির ব্যাপারে আমি স্যার আপনার কাছেই গিয়েছিলাম। গরীব মানুষ স্যার, দু’বেলা ভাতই জুটাতে কষ্ট হয়। অত টাকা কি আর আমাদের আছে?

অনিকেত হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। লোকটা তাকে কিছু বলে চলে গেল তাও সে শুনতে পেল না। চারদিকে এত অন্ধকার কেন? এই অন্ধকার এই শুনশান নীরবতা অনিকেতের বড় অসহ্য মনে হয়। একটু আলো কি কোথাও্ নেই যেন সে বাড়ি অব্দি পৌঁচ্ছুতে পারে?

২৪ জুন, ২০১৩



Sharing is caring! Please share with friends & family if you find this website useful

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *